গল্প জগৎ - (প্রভাত ঘোষ )
Bengali Love, Social, Political, Traveling, Heart Touching, Horror Stories and Novels written by Prabhat Ghosh. #Bangla Golpo #Premer Golpo #Detective Golpo #Bengali Story #Love Story #Detective Story
꧁ জীবনপিপাসু ꧂
অতীত - বর্তমান
ছেঁড়া উপন্যাস
কে যেন আসবে বলেছিল রঙিন ডানার প্রজাপতি হয়ে৷ দুর্গন্ধের আভাসে মৃত্যুও পথ বদলায়, শরতের মেঘের মতই৷ নীল বুকে উড়ে যেতে দেখি... ওরা অন্য বিছানায় সজত্নে ঘুমায় শান্ত ফোয়ারার মাঝে৷ সে সব ফিতেয় আদরের টান৷ হিসেবের খাতা ঠিক মিলিয়েও রাখে৷
বালিশের জল ছুঁয়ে দেখেছি যেদিন, বড় নিঃস্ব ছিল তাপ৷ যে ধোঁয়াতে উড়ে গেছে ছাই, তার কোন ঠিকানাই নেই৷
ইলিশেও গন্ধ জমেছে, বিষাক্ত৷
যারা আগুন বুকে ঘুমায় প্রতিটি রাত তাদের আমি স্বর্ণকার বলি৷ অক্ষরে অক্ষরে উপন্যাস ভরে যায়৷
নদীও হিসেব রাখে কী সাগরে কতখানি জল জমা হল?
একদিন গ্যালন গ্যালন জলোচ্ছাস দেখে ফিরে আসে পরিযায়ী পাখি৷ বাতাসও চিবুক ছুঁয়ে যায়৷
সেতারের ধুন নিষ্পাপ শান্তির নীড়ে... কোন এক চেনা চেনা গান....
"দুঃখ আমারে দুঃখী করেনি
করেছে রাজার রাজা...."
✍ প্রভাত ঘোষ.⚡
আকাঙ্খা ( একটি অপূর্ণতা )
সেদিন এক ফুরফুরে বাতাসের ছোঁয়ায় বড় পবিত্র ভেবেছিলাম নিজেকে৷ নতুন গাছে বসন্তের মুকুল৷ আনাড়ি পায়ে পায়ে নেচে উঠেছিল মন৷ বাগানে ফুল, আর ভ্রমর আসবে না... তাও হয়!
শুধু কিছু রসহীন পাপড়ি পড়েছিল৷
সময়ের আয়নায় মুর্খতা চেনা যায়৷ ততদিনে অর্ধশতাব্দি দিন পার৷ কোন এক অতিরিক্ত জ্ঞাণেন্দ্রিয় বলেছিল "আবার আসিবে ফিরে"৷ আবেগের কাছে হেরে যায় মুর্খ বিচার৷
শেষমেষ রাহু ঢোকে, ক্ষতির অভিপ্রায়৷ বিধ্বংসী ঝড়ের কোন ধর্ম নেই৷ বিবেকে ঘুণের ক্ষয়৷ অতঃপর সে কারোর নয়৷
রক্তাক্ত যোদ্ধা ওষুধ খোঁজে৷ নেশায় আসক্ত জীব হেরোইনে হিরোইন চাখে৷ আবার নেশাড়ু জীবনের পথে হেঁটে চলা রোজ৷
হোচট খাওয়াও এক পরিণত অভ্যাসের রোগ৷ পৃথিবীতে ভালবাসা যেন মিথেনের ট্যাঙ্কে শুয়ে অক্সিজেন খোঁজা৷
তবু যারা স্বপ্ন দেখে.. হৃদয়ে নতুন বীজ বোনে৷ ধমনীতে আকাঙ্খার গান....
" আবার হবে তো দেখা..
এ দেখাই শেষ দেখা নয় তো৷"
✍ প্রভাত ঘোষ.⚡
গুড মর্নিং
॥#গুড_মর্নিং॥ (১)
💎💎💎💎💎💎
💜💛💚💙💝
ট্রিং ট্রিং...💕💕
— হ্যালো...( ঘুম জড়ানো গলায় )
— হুম.. গুড মর্নিং..💛
— কে বলুন তো? এই ভর সন্ধে বেলায়...
— হা হা.. পাগল ভাবলে ? আরে, আমি সেই কালকের প্রোগ্রামের অ্যাঙ্কর "গুড মর্নিং" বলছি৷
— ওওহ্ ... হ্যা, কেমন আছ? আজ বিসর্জনে এলেনা?
— আমি আজ কলকাতায় ফিরলাম, সকালের ট্রেনে৷ বিসর্জনটা আমিও খুব মিস করলাম জানো...
— হ্যা, তা তো অবশ্যই করেছ৷ খুব মজা হল আজ৷ টায়ার্ড ও হয়ে গেছি বেশ৷ ঘুমোচ্ছিলাম, এই গুড মর্নিং এর ফোনে ঘুম ভাঙল৷ 😍
— হুম, সে তোমার গলা শুনেই বুঝেছি৷ তবে জানো, বিসর্জনের আগেই আমার কবিতার কিছু ছন্দ ফেলে এসেছি ওই মন্ডপেই৷
— আচ্ছা, হ্যা, দেখলাম ফেসবুকে একটা ছবি দিয়েছ..
— ছবিটার সাথে একটা কবিতাও লেখা আছে৷
— ওহহ্ .. ওটা দেখিনি তো৷ আচ্ছা দেখব অবশ্যই৷
— ওই ছবিটা আর কবিতার তৃতীয় লাইনের সবুজ শাড়িটায় খুঁজে দেখো, আয়নাতে নিজেকেই পাবে৷💗💙💞💞💚💖
ফোনটা কাটেনি তখনো, মন কিছু অনুভূতি ঠিকই মেপে নিয়েছে৷ শুধু কন্ঠস্বরগুলো স্তব্ধ৷ এভাবেও প্রেম শুরু হয়!!!
(চলবে...)
✍ প্রভাত ঘোষ..🌠
॥#গুড_মর্নিং॥ (২)
💎💎💎💎💎💎
ট্রিং ট্রিং...💓💓
মোবাইল নম্বর টা সেভ করাই আছে, এই রাত দশটা কুড়িতে ফোন!!! মনে ইতস্ততঃ বোধ৷ ফোনটা কেটে কলব্যাক...❣❣
দ্বিতীর রিং বাজতেই ফোন রিসিভ...💕
— হ্যালো...
— হ্যা, বলো৷ কেমন আছ?
— ভাল৷ আর তুমি?
— এই চলছে আর কী৷ কি করছ?
— খাবার খেয়ে শুয়ে শুয়ে মোবাইল দেখছিলাম৷ দেখি তোমার মেসেজ, তাই ভাবলাম একবার ফোন করে....
— ওহ, ওটা তো কালই করেছিলাম৷
— আমি এখনি দেখলাম৷ আচ্ছা, ঘুমের ডিস্টার্ব করলাম না?
— আরে না না, আমি এখনি ঘুমোই না৷ কিছু লেখালিখি করতে করতে বেশ রাত হয়ে যায়৷
— ওহহ্ .. আমিও কবিতা লিখি একটু আধটু.... তবে শুধুই নিজের জন্য৷ ওগুলো আমার মনখারাপ, কখনো বা ভাললাগার সঙ্গীও বলতে পার৷ 💙💛
— বাহ, তবে তো শুনতে হয় একদিন তোমার কবিতা৷
— আচ্ছা, সময় করে অবশ্যই শোনাব৷
— আজ একটা অনুগল্প লিখলাম জানো.. আমাদের কালকের ফোনে প্রথম কথা নিয়ে... সবটা সত্যি নয় যদিও, অনেকটাই আমার কল্পনার রং মাখিয়ে লেখা৷
— হুম.. আরে আমিও বুঝি মশাই৷ শোনাও না৷
গল্পের শেষ লাইন...
"কিছু অনুভূতি মন ঠিকই মেপে নিয়েছে৷ শুধু কন্ঠস্বর গুলো স্তব্ধ৷ এভাবেও প্রেম শুরু হয়!!!"💞💞
গল্পের শেষে আবার নিস্তব্ধ, দু-পক্ষই৷💛💖
— কি? কিছু বলছ না যে?❣
— সত্যি দারুণ লিখেছ৷ আমার ফেসবুক নেই তো কি হয়েছে? লেখকের গলায় লেখনি শোনার সৌভাগ্যও কজনের হয়? 💚
— আচ্ছা, এবার শুয়ে পড়৷ অনেক রাত হল৷💕
— তুমি কী প্রতি মাসেই বাড়ি আস?💙
— না, প্রতি সপ্তাহে৷
— ওহ.. দেখ কথায় কথায় রাত বাড়িয়ে দিলাম৷ খুব বকবক করি না আমি?
— যে গলার স্বর শুনে হাজার কবিতা লেখা যায় তাকে আর যাই হোক বকবক বলে না৷
রাত ১১টা কখন পেরিয়ে গেছে৷ ঘড়ির কাঁটার সাথে বেড়ে চলে রাত৷ চুপ কথায় কখন যে মনগুলো কাছে চলে আসে... মুঠোফোন, রাত আর নিঃশ্বাসের শব্দেরা সাক্ষি থেকে যায়৷💚💛💙💜💗 (চলবে...)
✍ প্রভাত ঘোষ..🌠
॥#গুড_মর্নিং॥ (৩)
💎💎💎💎💎💎💎
💖সারাদিন অফিসের কাজের ব্যস্ততার ফাঁকেও কালকের ফোনে বলা কথাগুলো বেশ মনে পড়ছিল৷ এর মধ্যেই কিছু কবিতার লাইন লিখে ফেলেই ফেসবুকে পোষ্ট৷ লাইক গোনা আর কমেন্টের রিপ্লাই দেওয়াটাও একটা রোজকার কাজ৷ বেশি লাইক না হলে কেমন যেন মনে হয় লেখাটা বোধহয় ঠিক হয়নি৷
💚 অফিস থেকে বেরিয়ে, ফ্ল্যাটে ফিরে আবার এক ভালবাসার সঙ্গীর সঙ্গ পাই রোজই৷ প্রিয় গীটারটাকে নিয়ে কত স্বপ্ন ভীড় করে আসে৷🎸
😴 রাতের খাবার খেয়ে শুয়ে শুয়ে ভাবছি কত লেখা বাকি রয়ে আছে! কত গল্প, উপন্যাস অর্ধেক লিখে পড়ে আছে৷ ভাবতে ভাবতেই ঠিক রাত দশটা বাইশে সেই চেনা নম্বর থেকে ফোন৷ জিও আছে বলে কলব্যাক করতে অসুবিধে নেই...
ট্রিং ট্রিং...💓💓
— হ্যালো... ( গলার স্বর খুব আস্তে )👄
— কি করছ?💛
— এই খাবার খেয়ে শুলাম৷ তুমি?
— আমিও এই শুলাম একটু আগেই৷💚
— হুম, বলুন...
— "বলুন"...!!! আবার আপনি কেন?
— মাঝে মাঝে একটু সম্মান দিতে হয় বুঝলেন৷ ( বোঝা গেল রসিকতাটা বেশ ভালই পারে৷)
— হুমম্.. বুঝলাম৷ 💙
(এরপর ভাবছি কী নিয়ে কথা বলা যায়৷ হঠাৎ সেদিনের ঘটনাটার কথা মনে আসতেই....)
আচ্ছা, সেদিন রাতে ওই লোকটার কথা মনে আছে?
— কোনটা বলতো?
— যে প্রোগ্রামের মাঝে ঝামেলা করল সেদিন..
— ওহ্ .. হ্যা, ওই মাতালটা? ফালতু লোক ছিল একটা৷
— হুম, ও আবার কমিটির মেম্বারদের কাছে নাকি ক্ষমা চেয়েছে পরে৷
— ওহহ.. ভাল হয়েছে৷ ওটাই দরকার ছিল৷
(বেশ কিছুক্ষণ চুপ দুজনেই)
— সেদিন আমাকে তো প্রতিযোগিতার জন্য যেতে বললে, নিজে আর গেলে না যে... এটা কিন্তু খুব বাজে৷
— হা হা, তার পর তো শেষ হয়ে গেল প্রোগ্রাম৷ তুমিও চলে গেলে বাড়ি৷ কিছুক্ষণ পর আমরাও চলে গেলাম৷💜
— হুম, আচ্ছা সেদিন তোমার কোলে একটা বাচ্চা ছিল, ওটা কে?
— (কোন ভনিতা না করেই স্পষ্ট ও দৃঢ় ভাষায়) ওটা আমার মেয়ে৷⚡⚡
💥 হঠাৎ যেন মনের দেশে কেউ পারমানবিক বোমা ফেলে গেল৷ নিস্তব্ধতায় ভরে গেল দিকশূন্যপুর৷ চারিদিক এলোমেলো গরম হাওয়ায় পুড়ে যাচ্ছে, ঝলসে যাচ্ছে ভাবনাগুলো৷ 🔥
(চলবে..)
✍ প্রভাত ঘোষ.🌠
🌓বিঃদ্রঃ — এটি মনস্তাত্বিক এবং সামাজিক পরিকাঠামো তুলে ধরার চেষ্টায় একটি ধারাবাহিক লেখনি৷ প্রথম এবং দ্বিতীয় পর্ব "প্রেম পিরামিড" এলবামে বর্তমান৷
গোধূলী
(পঞ্চাশ শব্দের অনুগল্প)
রবিবারের বিকেল, বিয়ের পরে এই প্রথম গঙ্গার পারে রাহুলের সাথে ঘুরতে গেল সৃজা৷ বাইকের রোমান্স, ফুরফুরে বাতাস, কিছু পুরান স্মৃতি তাজা হয়ে গেল, জুড়ল কিছু নতুনও৷ গোধূলীর আকাশের রঙে মিশে যেতে চাইছে হৃদয়৷
আজও আকাশটা সিঁদুরে রঙে রাঙা৷ সেই গঙ্গার ঘাট, সাদা শাড়ি, সৃজার সিঁথি থেকে মুছে গেছে গোধূলীর রঙ৷
✍ প্রভাত ঘোষ..🌠
আধভাঙা ঘুম
শরীর জুড়ে অস্বস্তির ঝড়, ভালো করে নিঃশ্বাস নিতে পারছে না রাহুল৷ পেটে ক্ষিধে, তবু উঠতে পারছে না৷ চোখের সামনে কিছুই স্পষ্ট দেখতে পারছে না৷ বুকে কেমন যেন একটা কষ্ট অনুভব করছে৷
হঠাৎ যেন পাশ থেকে সৃজা জড়িয়ে ধরে বলল..
— ওই, ওঠ৷ খেয়ে নাও আগে, তারপর ঘুমোবে৷
রাহুল ঠোঁট বাড়াল চুমু খাবার জন্য৷
পাশে কেউ নেই৷ ঘড়ির কাঁটায় রাত দুটো৷ কোলবালিশটা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল রাহুল৷
কাল ঠিক এই সময়েই সৃজার লাশ পুড়িয়ে ঘর ঢুকেছিল রাহুল৷
✍ প্রভাত ঘোষ..🌠
ডিটেকটিভ বিজয় — দিয়া রহস্য
👤.👽.প্রথম পর্ব.👽.👤
মুম্বইয়ের ইন্দিরানগর ক্রাইম ব্রাঞ্চ, ২০১৫ সালের ১০ই সেপ্টেম্বর, সকাল দশটা বাজে৷ অফিসার রাজীব দীক্ষিতের কেবিনে হাবিলদার মোহন সিং হাতে একটা ছবির সাথে এসে হাজির৷
—"স্যার, কলকাতা পুলিশের হেড অফিস লালবাজার থেকে একটা মিসিং ডায়রির ফ্যাক্স এসেছে৷ একজন লোক তার মেয়ের নিখোঁজ হবার ডায়রি করে দুদিন আগে৷ কলকাতা পুলিশের অনুমান সে মুম্বইতে আছে৷"
—"কই, ছবি আর ফ্যাক্স টা দিয়ে যাও৷"
দিয়া, বাড়ির একমাত্র এবং বড় মেয়ে, ছোট ভাই বিজয় ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে হলদিয়া গেছে৷ মা ক্যানসারে মারা গেছেন দু বছর আগেই৷ বাবা সুজিত সরকার পাঁচ বছর আগেই অবসর নিয়েছেন৷ কাজ করতেন এক বেসরকারী সংস্থায়৷ অবসরের সময় এককালীন পাওয়া টাকার বেশিরভাগই খরচা হয়ে যায় দিয়ার মায়ের ক্যানসারের পেছনে৷ তবুও বাঁচান যায়নি৷ মা মারা যাবার পর টাকার অভাবে তার গ্র্যাজুয়েশনের খরচ আর সংসারের হাল ধরার জন্য একটা কিছু উপার্জন করা খুব প্রয়োজন হয়ে পড়ে৷ গানের গলা ভাল থাকায় কাজ খুঁজতে খুব একটা কাঠখড় পোড়াতে হয়নি৷ একটা বারে গাওয়ার সুযোগ আসে৷ দিনে পাঁচশ টাকা বেতন, ছয় ঘন্টা কাজ৷ সন্ধে সাতটা থেকে রাত্রি একটা৷ হোটেলের গাড়ি আবার পৌছে দিয়ে যায় বাড়িতে৷ এভাবেই চলে দু-বছর৷
দেখতে অসম্ভব সুন্দরী হওয়ায় প্রচুর প্রস্তাবও আসে৷ না, বিয়ে বা প্রেমের নয়, বেশিরভাগই ছিল একটা রাত্রের প্রস্তাব৷ কটা বেশি টাকার লোভে চরিত্রকে বিকিয়ে দিতে চায়নি দিয়া৷ হঠাৎ একদিন তার বাবার সাথে গল্প করতে করতে বলে...
—"বাবা জানো, কদিন আগেই হোটেলে নামকরা চিত্রকার প্রতাপ গুহর সাথে পরিচয় হল৷ উনি বলেছেন মুম্বইয়ে খুব ভাল সুযোগ পাওয়া যাবে৷ যোগাযোগ আছে ওনার৷ ভাই তো কদিন পরেই হস্টেল থেকে চলে আসবে৷ তাই ভাবছিলাম যদি তুমি অনুমতি দাও".....
—"আমি আর কি বলব? তোর ওপর আমার বিশ্বাস আছে৷ তবে সবদিক দেখে-শুনে, ভেবে তারপর সিদ্ধান্ত নিস৷ খোকা তো চলেই আসছে বাড়িতে, আমাদের অসুবিধে হবেনা৷"
দিয়ার ভাই বিজয় তার ইঞ্জিনিয়ারিং এর পড়া শেষ করে বাড়ি ফিরছে কদিন পরেই৷ এবার আর কোন অসুবিধে নেই৷ ভাইটা চাকরির জন্য চেষ্টা করুক না, ততদিন দিয়া মুম্বই থেকে টাকা পাঠিয়ে যাবে বাড়িতে৷
প্রতাপ বাবুর খুব পরিচিত এক হোটেলের মালিক মিঃ অগরওয়ালের সাথে পাকা কথা হয়ে গেছে দিয়ার৷ মাস গেলে তিরিশ হাজার মাইনে৷
৩০শে জুলাই, রাত্রি ৮টা বাজে ঘড়িতে৷ বাড়ির সামনে একটা ট্যাক্সি এসে দাঁড়াল৷ সুজিত বাবু বারান্দায় পায়চারি করছিলেন৷
— "কি রে? দিয়া! এখন ফিরলি যে? শরীর ঠিক আছে তো?
— হ্যা বাবা, ঠিক আছে৷ ভেতরে চল বলছি সব৷
(বাড়ির ভেতর ঢুকে)
— বাবা, মুম্বই থেকে ফোন এসেছিল৷ কালই যেতে হবে৷ ওদের হোটেলে আগে যে গান করত মেয়েটি, সে হঠাৎ আসা বন্ধ করে দিয়েছে৷ মিঃ অগরওয়াল কালই ফ্লাইট ধরে আসতে বলছেন৷ টিকিট উনি অনলাইনে পাঠিয়ে দেবেন বলেছেন৷
— কিন্তু তোর ভাইয়ের আসতে তো এখনো কদিন দেরি আছে৷ তুই এখনি এভাবে চলে যাবি? ওর সাথে দেখাটা করে যেতিস৷
— দূর্গা পূজোর সময় এক সপ্তাহ ছুটি দেবে বলেছেন মিঃ অগরওয়াল৷ এখন ওদের ব্যবসার খুব ক্ষতি হচ্ছে কি না তাই যেতে বলছেন৷
— তা বলে এভাবে? একদিন আগে ফোন করে... আমার কেমন যন ঠিক লাগছে না মা৷ তুই আরও একটু ভেবে দেখ৷
— কোন অসুবিধে হবেনা বাবা৷ আমি প্রতাপ বাবুর সাথেও কথা বলেছি৷ উনিও আশ্বাস দিয়েছেন৷
এভাবেই বেশ কিছু কথার পর শেষে রাজি হয়ে যান৷
৩১শে জুলাই সকাল ৭টায় ফ্লাইট৷ এয়ারপোর্টে ছাড়তে আসেন সুজিত বাবু৷
—পৌছে ফোন করিস৷
— হ্যা বাবা করব৷ প্রতিদিন সকালে উঠে, কাজে যাবার আগে আর ফেরার পর তোমাকে ফোন করব৷ ভাইকে ফোন করে বললাম সব৷ ও কাল দুপুরেই ফিরে আসছে কলকাতা৷
ফ্লাইটের খবর হয়ে গেছে৷ একটা প্রনাম করেই ভেতরে ঢুকে যায় দিয়া৷ কাঁচের বাইরে থেকে দিয়াকে হাত নাড়েন সুজিত বাবু৷ একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে চোখ থেকে৷
ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে বাড়িতে বসে তিনটে কাজ বিজয়ের৷ রান্না করা, অনলাইনে চাকরির খোঁজ, আর রহস্য গল্প পড়া৷ সে এক ডিটেকটিভ গল্পের পোকা৷ তারই মত আর এক পোকা রয়েছে সেই পাড়াতেই৷ তিন্নি, বিজয়ের পাড়াতুতো বোন৷ সদ্য গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেছে৷ বিজয়ের আর একটা অভ্যেস ব্লগ লেখা৷
এভাবেই চলতে থাকে, দিন পেরিয়ে মাস৷
৮ই সেপ্টেম্বর সকাল থেকে কোন ফোন আসেনি দিয়ার৷ দুপুরে খেতে বসার সময় সুজিত বাবু জিজ্ঞাসা করে...
— হ্যা রে বিজয়, তোর দিদির ফোন এসেছিল?
— কই না তো৷
— দেখ না, সকাল থেকে মেয়েটার কোন খবর নেই৷ কাল বলেছিল একবার প্রতাপ বাবুর সাথে দেখা করতে যাবে৷ কই ফিরেও একটা ফোন করেনি৷
— দাঁড়াও, আমি একটা ফোন করে দেখি৷
(ফোনের রিং বেজে যায়.. )
— না বাবা ধরল না ফোনটা৷
— তাহলে হয়তো ঘুমোচ্ছে৷ বলেছিল আজ নাকি ছুটি আছে৷ বিকেলে করিস একবার৷
— আচ্ছা৷
আগাথা ক্রিস্টির একটা বই পড়তে নিয়েছিল বিজয় তিন্নির কাছ থেকে৷ দুপুরে শেষ করে পাড়ার বাচ্চাদের মাঠের সামনে দেখা করে ফেরত দিতে যায়৷
— (তিন্নি আসেনি এখনো, একবার দিদিকে ফোনটা করে নিই এখনি৷)
(ফোন বেজে যায়...)
ততক্ষণে তিন্নি চলে আসে৷
— কি গো বিজয় দা, কাকে ফোন করছ?
(ঘুরে দেখে তিন্নি )
— দেখ না দিদিটা কাল থেকে ফোন করেনি৷ এখনও ফোন করলাম, ধরল না৷
— দিয়া দি যেখানে থাকে তার মালিকের কোন নাম্বার নেই?
— বাবার কাছে আছে হয়ত৷ যাই একবার পি.জি র মালিকের নাম্বারটা নিয়ে কথা বলি৷ আসছি রে৷
বাড়ি ঢুকতেই সুজিত বাবু....
— কি রে, ফোন তো এখনো ধরছে না৷ কি হল বলতো? আমার খুব চিন্তা হচ্ছে৷
— আমাকে পি.জি র মালিকের আর প্রতাপ গুহ দুটো নাম্বারই দাও তো৷
— এই নে... ( মোবাইল টা বাড়িয়ে দিয়ে..)
নম্বর টা নোট করেই ফোন...
— হ্যালো, আমি দিয়া সরকারের ভাই বিজয় বলছি৷ মাফ করবেন, দিদির ফোনে লাগছে না তাই আপনাকে ফোন করলাম৷ দিদি কি ওখানে আছে?
ওপাশের কথা শুনে হঠাৎ মুখটা শুকিয়ে গেল বিজয়ের৷ কপালের ভাঁজে আশঙ্কার ছাপ দেখা গেল৷ সুজিত বাবু জিজ্ঞেস করল...
— কি রে, কি বলল?
— বলল দিদি কাল থেকে পিজিতে আসেনি৷ আমি প্রতাপ গুহর নাম্বারে একটা কল করি৷
( ফোন বেজে গেল কেউ রিসিভ করেনি.... আবার একবার ফোন....)
—হ্যালো, আমি কলকাতা থেকে বলছি দিয়া সরকারের ভাই৷ দিদির ফোনে লাগছে না, আপনি যদি কোন খবর দিতে পারেন৷ (গলায় একটু ভয়ের আভাস) আসলে কাল থেকে দিদির সাথে কথা হয়নি৷ কোন খবরও পাচ্ছিনা৷ প্লিজ যদি একটু হেল্প করেন....
কথা শেষে ফোন রেখে জীর্ণ সোফাটায় বসে পড়ল বিজয়....
(দ্বিতীয় পর্ব)
👽👽👽👽👽👽👽👽👽
৯ই সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা৷ গড়িয়া পঞ্চসায়র থানা৷ সুজিত বাবু ছেলে বিজয়কে সঙ্গে নিয়ে, বড়বাবু সঞ্জয় বাগদির অপেক্ষায় বেঞ্চে প্রায় দু ঘন্টা বসে৷ ঠিক সকাল ১০টা ৫, বড়বাবু রোদ্দুর মাথায় একটু বিরক্তির সাথে অফিসে ঢুকলেন৷ হাবিলদার মদন রায় চাপা গলায় বললেন...
— এই যে, কী যেন নাম আপনার?
— সুজিত সরকার৷ ( ভয়ে ভয়ে)
— বড়বাবু এসেছেন৷ দাঁড়ান বলে দেখি কি বলে৷
— আচ্ছা৷ ( বলে ঘাড় নাড়লেন )
মিনিট দশেক পর মদন বাবুর গলা...
— এই যে, এদিকে আসুন৷ বড়বাবু ডাকছেন৷
সসব্যস্ত হয়ে উঠে সুজিত বাবু এগিয়ে গেলেন দরজার কাছে৷ পেছনে বিজয়৷
— ভেতরে আসুন৷ ( বড়বাবুর গলা ).. বসুন... বলুন কি ব্যাপার?
— স্যার, আমার মেয়ে দিয়ার পরশু রাত থেকে কোন খবর নেই৷ মুম্বই গেছে৷ ওখানে পিজিতে থাকে৷ পিজির মালিককে ফোন করলাম, বলল গত দুদিন সেখানে আসেনি৷ খুব দুশ্চিন্তায় আছি তাই...
— তাই চলে এলেন পুলিশের কাছে৷ দেখুন কারো সাথে কোথাও পড়ে আছে কি না৷ কদিন অপেক্ষা করুন, ঠিক ফোন করবে৷ আজকালকার বাইরে থাকা ছেলে মেয়েরা সব এরকমই৷ বাইরে গিয়ে লেজ গজিয়ে যায়৷
বিজয়ের কপালের ভাঁজে রাগের ছায়া স্পষ্ট৷
সুজিত বাবু ভয় মিশ্রিত গলায়...
— না স্যার, ও ওরকম নয়৷ প্রতিদিন নিয়ম করে ফোন করে বাড়িতে৷
— ও সবাই তাই বলে৷ আচ্ছা একটা মিসিং ডায়রি লিখে যান, মুম্বইয়ের সব ঠিকানা সমেত৷ দেখছি কী করা যায়৷
— আচ্ছা৷
দুপুর ১২টা বাজে৷ পুলিশ স্টেশন থেকে বাড়ি ফিরে রান্না চাপাল বিজয়৷ সুজিত বাবু তখনো সোফায় বসে৷
—বাবা, তুমি স্নান করে নাও আগে৷ অত চিন্তা কর না৷ পুলিশে তো খবর দেওয়া হয়েছে৷ আজ সন্ধেবেলা একবার ফোন করব হোটেলে৷
বাবাকে বারণ করলেও মনে মনে এ ঘটনার সম্ভাব্য হাজার কারণ আর সমাধানের চিন্তা করে চলেছে বিজয়৷
সন্ধেবেলা হোটেল থেকেও কোন খবর পেলনা৷ পায়চারি করতে করতে ফোন করল তিন্নিকে৷
— তিন্নি, মুম্বইতে তোর কোন এক মাসি থাকে না?
— হ্যা, কেন বলতো?
—কাল সকাল সাড়ে ৯টায় দেখা কর, লাইব্রেরিতে৷ কথা আছে৷
পাড়ার লাইব্রেরির ঘড়ির কাঁটায় পৌনে দশটা৷ ম্যাগাজিনটা খুলে বার বার সামনের দেয়াল ঘড়িতে দেখছে বিজয়৷ তড়িঘড়ি করে ঢুকল তিন্নি...
— সরি বিজয় দা, একটু লেট হয়ে গেল৷ বল কি ব্যাপার৷
— চল আগে ওই কোনার বেঞ্চে বসি৷ ... আচ্ছা শোন, আমি ভাবছি মুম্বই যাব৷ পুলিশের যা ভাব গতিক দেখলাম, আমার ঠিক ভাল লাগছে না৷ কেমন যেন দায়সারা কথাবার্তা৷ তাই ভাবলাম আমি যদি মুম্বই গিয়ে দিদির খোঁজ করি৷ ঠিকানা তো সবই আছে বাবার কাছে৷ তাই বলছিলাম ওখানে কদিন থাকার জন্য যদি একটা ব্যবস্থা হয়...
একনাগাড়ে কথাগুলো বলে একটু থেমে তিন্নির মুখের ভাবে কিছু বোঝার চেষ্টা করল৷ বেশ স্বাভাবিক ভাবেই তিন্নি বলল...
— হ্যা, ওখানে থাকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে৷ আমি ঠিক আঁচ করেছিলাম এরকমই কিছু একটা ব্যপার, তাই মাসিকে সকালেই ফোন করেছিলাম৷ বললাম আমি মুম্বই যাব কয়েকদিনের জন্য৷ কতদিন বাড়ি থেকে কোথাও বেরোন হয়নি৷
— সে ত তুই যাবি বলেছিস, আমার ব্যপারে তো বলিসনি৷
— ও আমি বলে ম্যানেজ করে নেব, চাপ নিওনা৷
— আচ্ছা, তাহলে কালকের ট্রেনে গেলেই হয়, শুভস্য শীঘ্রম৷
— আমি মা কে বলে দুপুরে জানাচ্ছি৷ তেমনি হলে অনলাইনে তৎকাল টিকিট বুক করে নিও৷
— ঠিক আছে৷ তাড়াতাড়ি জানা৷ আমিও বাবাকে বলে রাজি করছি৷
(লাইব্রেরি থেকে উঠে পড়ে দুজনেই)
১০ই সেপ্টেম্বর দুপুর ২টো হাওড়া স্টেশনে হাজির সুজিত বাবু, বিজয়, তিন্নির বাবা আর তিন্নি৷ ট্রেন ২টো চল্লিশে, ঠিক সময়েই ছাড়ল৷
ট্রেন চলছে, শুরু হল দুজনের গল্প৷ বেশ কিছুক্ষণ পর একটু বোরিং লাগছে বলে অনলাইনে ইউটিউব খুলে দেখতে দেখতে হঠাৎ তিন্নি কিছু একটা দেখে চমকে ওঠে৷ জানালার ধারে বিজয়ের চোখটা একটু লেগে এসেছে৷ তিন্নি ডেকে বলে...
— বিজয় দা, ও বিজয় দা... ওই লোকটার নাম প্রতাপ গুহ না? যার ভরসায় দিয়া দি মুম্বই গিয়েছিল৷
— হ্যা, কেন বলতো?
— আমি ইউটিউব দেখতে দেখতে ওনার একটা ইন্টারভিউ পেলাম৷ রিপোর্টারের একটা প্রশ্ন শুনে আমার কেমন খটকা লাগছে৷ এই দেখ..
(বলে ফোনটা বাড়িয়ে দিল দিয়া)
ভিডিও টা দেখেই কান থেকে ইয়ারফোন টা খুলে তিন্নি কে দিয়ে...
— (একটু রেগে) না, ও সব ফালতু খবর৷ দিদি এরকম কখনোই নয়৷ ফালতু খবর যত সব...
— হতে পারে, কিন্তু একবার ভাব যদি সত্যি হয় তবে এই লোকটার সাথে দিয়া দি র বেশ ভালই যোগাযোগ আছে৷ তা হলে এর কাছে তো কিছু খবর নিশ্চই পাওয়া যাবে৷
— প্রতাপ গুহ কে ফোন করেছিলাম৷ কথা এমন বলল যেন দিদির সাথে খুব একটা যোগাযোগ নেই৷
— আমার কিন্তু একটু সন্দেহ হচ্ছে বিজয় দা৷
— হুম, কোথাও একটু সুর কাটছে মনে হচ্ছে৷ যদি এতই কাছের সম্পর্ক হয় তবে ওনার জানার কথা দিদির ব্যপারে৷ আবার একটা জিনিস খটকা লাগছে..
— কি?
— এই ক মাসেই এরকম সম্পর্ক যে মিড়িয়ায় চলে এল!!
#ক্রমশ...
✍ প্রভাত ঘোষ..🌠
মরনের পরে
অফিসে প্রোজেক্টারে প্রেজেনটেশন শুরু করবে এবার৷ কোম্পানির নতুন ম্যানেজার পদ পেয়েছে রাহুল৷ প্রেজেন্টেশনের মাঝে হঠাৎ যেন ঝিলিকের মুখটা দেখতে পেল৷ কিছুটা ঘাবড়ে গেলেও সামলে নিল নিজেকে৷ অফিস শেষ করে নিজের গাড়ি চালিয়ে ফ্ল্যাটে ফেরার সময় মনটা কেমন উতলা হয়ে উঠল৷ হঠাৎ কেন ঝিলিকের মুখ দেখতে পেল প্রজেক্টারের আলোতে?
ঠিক করল কাল সকালেই বাড়ি যাবে৷ এবার ঝিলিকের সাথে এনগেজমেন্ট করেই দিল্লি ফিরবে৷ অফিসে এমারজেন্সি বলে ফোন করে ছুটি নিয়ে নিল৷ ভোরেই ফ্লাইট ধরে কোলকাতা, তারপর শিয়ালদা থেকে লোকাল ট্রেন ধরে সুভাষগ্রাম৷
ঠোঁট দুখানি মিলবে আবার ঠিক মরণের পারে৷"
✍ প্রভাত ঘোষ...🌠
সংগ্রামী
#বটুকেশ্বর_দত্ত :
পূর্ব বর্ধমান জেলার "ওয়ারি" গ্রামে জন্ম ১৯১০ সালের ১৮ই নভেম্বর৷ কলেজে পড়ার সাথে সাথেই বৃটিশদের শৃঙ্খল থেকে দেশকে মুক্ত করার প্রতিজ্ঞা দৃঢ় হয়ে বাসা বাঁধে ওই ছোট্ট হৃদয়ে৷ ভারতের স্বাধীনতার উদ্দেশ্যে যোগ দেন উত্তরপ্রদেশের কানপুরের Hindustan Socialist Republican Associatio এ৷ প্রথম বোমা তৈরির হাতেখড়ি শুরু হয় সেখানেই৷ ধীরে ধীরে চন্দ্রশেখর আজাদ এবং ভগৎ সিং এর সাথে পরিচয়৷
এই প্রসঙ্গে আরও একজনের নাম উল্লেখ করতেই হয়, স্বামী কুমারানন্দ৷ ইনি বহুবার বটুকেশ্বর দত্তকে আশ্রয় দিয়ে বৃটিশ পুলিশের হাত থেকে রক্ষা করেন৷
১৯৬৫ সালে টিউবারকিউলোসিস রোগে আক্রান্ত হয়ে AIIMS হাসপাতালে মৃত্যু হয়৷
জয় হিন্দ
✍ প্রভাত ঘোষ...
ভালবাসার রাজনীতি
*** প্রথম পর্ব ****
বিয়েবাড়ির অনুষ্ঠান, সকাল থেকেই বক্সে সব নতুন বাংলা গানের সুর৷ কখনো বা একটু পুরান মিতা চ্যাটার্জির গান "পালকিতে বৌ চলে যায়"৷ আবার একবার করে সেই খুব চেনা রবীন্দ্রসঙ্গীত "আমার পরান যাহা চায়"৷
নন্দিনী, সিউড়ির লাভপুর গ্রামের এক খুবই সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে৷ সদ্য গ্র্যাজুয়েশনের ফাইনাল ইয়ার দিয়েছে শম্ভুনাথ কলেজ থেকে৷ গায়ের রঙ একটু শ্যামলা হলেও মুখশ্রী বেশ সুন্দর৷ নন্দিনী বেশ প্রানচঞ্চল পরীর মতো৷ মেয়ের বিয়ের বয়স হয়েছে বলে বাড়ি থেকে ভাল একটা সম্বন্ধ দেখেছে৷ ছেলের বেশ ভাল ব্যাবসা আছে আসানসোলে৷ কয়লার ব্যাবসা৷ যাই হোক, ছেলের বাড়ি বেশ বড়লোকই বলা যায়৷ তাই আর দেরি না করে সম্বন্ধ পুরো পাকা৷
রাহুল, বেশ সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান, নন্দিনীর খুব ভাল বন্ধু৷ একই কলেজ থেকে পাশ করেছে দুজনে, শুধু সাবজেক্টটাই যা আলাদা ছিল৷ নন্দিনীর বাংলা আর রাহুলের ইকনমিক্স৷ পরিচয়টা বেশ সহজাত ভাবেই হয় নবীন বরনের দিন৷ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতাটা দারুন বলেছিল নন্দিনী সেদিন কলেজের মঞ্চে দাঁড়িয়ে৷ রাহুলও কবিতা বেশ পছন্দ করে৷ হয়ে গেল আলাপ সেই রবি ঠাকুরের ছন্দ ধরেই৷
রাহুল বেশ ভাল গীটার বাজায়৷ সেই সূত্রে ভালই নাম ডাক কলেজে৷ পড়াশুনাতেও বেশ ভাল, তার সঙ্গে সেই গিটারিস্টদের মত স্টাইলিশ লুক৷ কত মেয়ে যে পেছনে পড়েছিল তার ইয়ত্তা নেই, কিন্তু রাহুলের পছন্দ সেই চুড়িদার পরা চুল খোলা নন্দিনীকে৷ বলতে পারেনি যদিও কখনো৷ একদিন বলতে চেয়েছিল বৈকি মনের কথাটা অকপটে, কিন্তু পারেনি৷ ঐ একটাই ভয়, বন্ধুত্ব হারাবার৷ কষ্টে বুকের পাঁজরের হাড়গুলো হৃদয়ে ড্রাম বাজালেও পারেনি সে বলতে, আর হয়তো কোনদিন পারবেও না৷ তার গোপন ভালবাসা হয়তো বৃষ্টিহীন খরা জৈষ্ঠে অসহায় তৃষ্ণার্ত ধান গাছের মতো আস্তে আস্তে ঢলে পড়বে মৃত্যুর বুকে৷ তবু তার বন্ধুত্ব সর্বদাই খামারে পড়ে থাকা খড়ের মতো সেই জৈষ্ঠের স্মৃতি হয়ে থেকে যাবে আজীবন৷
তার এই মনের কথার স্বাক্ষী ছিল মাত্র একজনই, নন্দীনির কাকার মেয়ে স্বপ্না৷ সেও একই কলেজেই পড়ত৷ যেদিন প্রথম জানতে পারে কথাটা সেদিন নন্দিনী কলেজে আসেনি৷ ছিল বৃষ্টির দিন, তাই কমন রুমে রাখা গীটারটা নিয়ে আপন মনেই গান গাইছিল রাহুল.....
"ক্যা জানু সজন হোতি হ্যা ক্যা গম কে শাম, জ্বল উঠে শ দিয়ে জব লিয়া তেরা নাম"....
স্বপ্না আবার একটু বেশি স্টাইলিশ, জিন্সের সাথে হলুদ টপ পরে কমন রুমে ঢোকার আগেই শুনতে পায় গিটারের শব্দ৷ একটা চেয়ার টেনে মন দিয়ে শুনছিল রাহুলের গান৷ গান শেষ হতেই...👏👏👏👏👏👏 হাততালি...
—"উফফ রাহুল, যা গাইলি না গানটা..."
—"থ্যাঙ্ক ইউ..☺"
—"তা এত কষ্ট কার জন্য শুনি?"
—"আরে না, তেমনি কিছু নয়৷"
—"আচ্ছা, এবার নভেম্বরে যে প্রোগ্রাম আছে কলেজে ওখানে গাইবি তো?"
—"হ্যা, ভাবছি তাই৷"
—"তোর গান আমার দারুন লাগে৷ আর..."
—"আর কি? বল..."
—"নাঃ, কিছু না৷"
—"আচ্ছা স্বপ্না শোন না, নন্দিনী আজ আসেনি কেন রে? তোরা তো একই সাথে আসিস৷"
—"ওহঃ, ওর জ্বর হয়েছে, কদিন আসবেনা"
কথাটা শুনে রাহুলের কতটা খারাপ লাগল সেটা মুখ দেখলেই যে কেউ বুঝতে পারবে৷
—"কেন রে? আজ নন্দিনীর জ্বরের কথা শুনে এত খারাপ লাগছে যে তোর?"
—"তেমন কিছু না৷ শরীর খারাপ বললি তো তাই৷"
—"আচ্ছা, আমিও তো আগের মাসে জ্বরে পড়ে কলেজ আসিনি তিন দিন, আমার কথা জিজ্ঞেস করেছিলি?"
এ কথার মানানসই উত্তর খুঁজে পায়না রাহুল৷
—"কি রে, বললি না যে৷"
—"হ্যা, নন্দিনী বলেছিল৷"
—"ওহ, মানে তুই জানতে চাসনি৷"
এবার আর কিছু বলতে পারল না রাহুল৷ ভগবান সহায় হয়ে যাক বৃষ্টিটা ততক্ষণে থেমে গেছে৷ রাহুল বলল...
—"স্বপ্না, চল বৃষ্টি থেমে গেছে৷ এবার যাওয়া যাক৷"
স্বপ্না এই মুহুর্তটা হারাতে চাইছিল না, তবুও যেতেই হল৷ রাহুলকে মনে মনে বেশ পছন্দ করলেও নন্দিনীর প্রতি বেশি মনযোগ দেওয়া একেবারেই সহ্য করতে পারত না৷ একদিন ওর মোবাইলে কলেজের গ্রুপ ফটো থেকে ক্রপ করে শুধু নন্দিনী আর রাহুলের একসাথে তোলা ছবিটা Wall Paper করে রাখা দেখে স্বপ্নার বুঝতে অসুবিধে হল না৷
নন্দিনীর প্রতি একটা ঈর্ষা মনের মধ্যে ধীরে ধীরে পুষছিল স্বপ্না৷ একদিন তিনজনেই আছে কমন রূমে ক্লাস শেষের পর, এমন সময় স্বপ্না রাহুলের হাতটা ধরে বলল...
—"রাহুল, আজ একটা গান শোনা না৷ অনেকদিন শুনিনি তোর গান৷"
যদিও এটা শুধুই নন্দিনীকে দেখাবার জন্যেই ছিল৷ আবার মাঝে মাঝে বাড়িতেও কথার মাঝে খোঁটা দিত...
—"তোর বিয়েতে কলেজের সবাই মিলে একজায়গায় আসর জমিয়ে বেশ আড্ডা দেব৷ রাহুলকে বলব গীটারটা নিয়ে আসতে৷ সবাই মিলে বরযাত্রি যাব, খুব মজা হবে৷"
এসব কথায় যদিও নন্দিনী কিছুই মনে করত না৷ তবে বেশ বুঝতে পারত রাহুলের প্রতি ওর ক্রাশ৷
*** দ্বিতীয় পর্ব***
বিয়ের ঠিক আগের দিন ফাইনাল ইয়ারের রেজাল্টের কথাটা Whats app গ্রুপেই জানতে পারল নন্দিনী৷ স্বপ্নাকেও জানাল...
—"বুনি, আজ কলেজে রেজাল্ট তুই জানিস?"
—"হ্যা জানি, কিন্তু আজ আর যাবনা৷ তোর বিয়ের পরই আবার কলেজ যাব৷ কালই তো ফেসিয়াল করলাম, এখন কদিন বাইরে বেরোবনা৷ তুই গেলে যা, বিয়ের পর কী আর যেতে পারবি৷"
এ ধরনের কথা এখন গা সওয়া হয়ে গেছে, কিছু মনে হয়না৷ নন্দিনী বেরোল কলেজের উদ্দেশ্যে৷ বেশ মেঘলা আকাশ, বৃষ্টি তখনো হয়নি৷ রাহুলের সাথে ফোনে কথা বলে জানল সেও আসছে৷ এরপর কলেজে পৌছে লিস্ট দেখে মনটা শান্ত হয়৷ ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করেছে৷ সবার সাথে ক্যান্টিনে দেখা, রাহুলও আছে৷ বিয়ের কথা জানে তো সবাই তাই আজকের আড্ডার মুখ্যমণি নন্দিনী৷ রাহুল কেমন যেন একটু বেশিই চুপচাপ আজ, তার পাশেই বেঞ্চে বসা রাহুলকে একটু ঠেলা দিয়ে...
—"কি রে, কিছু ভাবছিস নাকি?"
—"না, কই কিছু না তো৷"
—"আচ্ছা, কাল সকাল সকাল চলে আসিস বাড়িতে৷"
—"বিয়ের জন্য খুব তাড়া ছিল না রে তোর?"
হঠাৎ এরকম কথায় একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে৷ যদিও নন্দিনী কিছুটা হলেও বুঝতে পারত রাহুলের মনের না বলা কথা৷ তবুও পরিবারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে মেনে নিয়ে মত দেয় বিয়েতে৷ কথা ঘোরাবার জন্য বলল..
—"দেখ এবার মেঘ কিন্তু বেশ কালো হয়ে আসছে৷ বৃষ্টি নামার আগে বাস ধরতে হবে৷ চল্ , উঠতে হবে এবার৷"
বলেই মার্কশিট ভরা ফাইলটা ব্যাগে ভরে উঠে গেল নন্দিনী৷ রাহুলও আর কথা না বাড়িয়ে চলল সঙ্গে৷ বাসে উঠেই শুরু হল বৃষ্টি৷ প্রায় একঘন্টা পর বাস স্ট্যান্ডে নেমে দাঁড়াতেই হল একটা দোকানে৷ রাহুলও সঙ্গেই আছে৷ মাঝে মাঝে কিছু কথা,আবার নিস্তব্ধতা৷
সন্ধে তখন ৬:৩০, বৃষ্টি থেমেছে কিন্তু মেঘ তখনো ঘোর করে আছে৷ রাহুল বলল...
—"চল্ , তোকে বাড়ি পর্যন্ত ছেড়ে দিয়ে আসি৷"
—"না না, তার দরকার নেই৷ এই তো একটুখানি, একাই হেঁটে চলে যাব৷ তুই বাড়ি যা, কাল সকাল সকাল চলে আসিস৷ তোরা সবাই থাকলে ভাল লাগবে৷"
—"সামনে জঙ্গল পেরিয়ে প্রায় কুড়ি মিনিট হাঁটতে হবে তোকে একা৷ এই সময় কোন রিক্সাও তো দেখছি না৷ আমি বরং যাই তোর সাথে৷"
—"আরে বলছি তো আমি ঠিক চলে যাব, তুই যা বাড়ি৷ তোর নাহলে বাড়ি ঢুকতে অনেক দেরি হয়ে যাবে৷"
হাঁটা দিল নন্দিনী৷ একটু ঝোড়ো হাওয়া ছলছে৷ রাস্তার পাশের আলোগুলো জ্বলে গেছে, কিন্তু এক গাঢ় নিস্তব্ধতা যেন গ্রাস করেছে অঞ্চলকে৷ বেশ কিছুদূর যেতেই দুটো বাইকের হর্ণ দেবার শব্দ এল পেছন থেকে৷ দু বার, চার বার, এবার একদম সামনে এসে দ্রুত হাঁটতে থাকা নন্দিনীকে লোলুপ দৃষ্টিতে দেখতে দেখতে এগিয়ে গেল বাইকগুলো৷ খানিকটা এগিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল৷ দেখে মনে হচ্ছে মদ্যপ, নিজেদের মধ্যেই গালাগালি করছে৷ একটু সামনে আসতেই শুনতে পেল...
—"ভাই, কি লাগছে মালটা৷ সাইজ দেখেছিস?"
কথাটা শুনতে পেল নন্দিনী৷ ঘৃনার দৃষ্টিতে ওদের দিকে তাকিয়ে আবার পাশ কাটিয়ে যেতে লাগল, এবার ঘটল বিপত্তি৷
১ম ব্যাক্তি —"আরে মালটা এভাবে দেখল কেন বলতো? চল শালিকে দেখছি আজ৷"
২য় ব্যাক্তি — " ওরে মাগি, খুব তেজ দেখছি৷"
বলেই পেছন থেকে ওড়না টেনে নিল৷ বেশ সপাটে চড়টা কষাল পেছন ঘুরে নন্দিনী৷
৩য় ব্যাক্তি — " এই শালি, গায়ে হাত তুললি! ওঠা শালা একে৷"
দুহাত ধরে নিল একজন৷ পেছন থেকে মুখটা ওড়না দিয়ে বেঁধে দুজন পা দুটো ধরে উঠিয়ে নিয়ে যেতে যেতে খিস্তি আওড়াতে লাগল৷ নন্দিনী তখন আধকাটা জ্যান্ত মাছের মত ছটফট করতে লাগল৷ পা দিয়ে লাথি মারার চেষ্টা বিফল৷ রাস্তা থেকেই একটু দূরে একটা ঝিল, তার ধারেই বুনো খেজুর আর কিছু বুনো গাছের ঝোপ৷ পাশেই মাটিতে ফেলে দিল নন্দিনীকে৷ এরপর প্রায় আধঘন্টা ধরে সেই আধকাটা ছটফট করা মাছের শরীরে একের পর এক বড়শির আঘাত৷ প্রতিটি আঘাতের চিৎকার বাঁধা পড়ে থাকে ওড়নার শক্ত বাঁধনে৷ প্রতিবার হৃদয় করে হাহাকার, নষ্ট শরীরে ওঠে বেদনার ঝড়৷ না, শুধুই শারীরিক নয়, সামাজিকতার সংবিধানের পাতায় কালো দাগের কথা মনে হতেই এক অসহ্য বিবেক দংশনে নিথরের ন্যায় অসাড় শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ে রয় ঘাসের বিছানায়৷ এখনো মদ্যপ দানবেরা অত্যাচার ছাড়েনি৷ হঠাৎ একজনের মনে হল .....
—"এ ভাই, মরে গেছে মনে হচ্ছে৷ ওঠ, পালা....."
এবার পালাল তিনজনেই৷
*** তৃতীয় পর্ব ***
— "না, মরেনি এখনো, নিঃশ্বাস চলছে৷ মুখে জলের ছিটা দে৷ জল আন রে কেউ৷ নন্দিনী, এই নন্দিনী, ওঠ দেখ আমি রাহুল৷ ওরে, তোরা এম্বুলেন্সকে ফোন করেছিস?"
রাত্রে নন্দিনীর ফোনে বারবার কল করে রাহুল৷ ফোন বন্ধ দেখে শেষে স্বপ্নাকে ফোন করে জানতে পারে বাড়ি ফেরেনি৷ ততক্ষণে নন্দিনীর বাড়িতে দুশ্চিন্তার ছায়া৷ পুলিশের সাথে সারারাত তন্নতন্ন করে খুঁজে শেষে ভোরের আলো ওঠার কিছুক্ষণ পর দেখতে পাওয়া যায় তার সজ্ঞাহীন দেহ৷ দেখামাত্রই নিজের জামা খুলে বেঁধেদেয় নন্দিনীর কোমরের সাথে৷
হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষ৷ জ্ঞান ফিরে এসেছে ঘন্টাখানেক পর৷আজই তো বিয়ের দিন৷ রাত্রে বরযাত্রি আসবে৷ ছেলের বাড়িতে তখনো কোন খবর যায়নি৷ হঠাৎ ঘটা এহেন ঘটনা পাত্রির বাবার মুখের ভাষা কেড়ে নিয়েছে৷ যেন এক জড় পদার্থ সর্বক্ষণ ওই মা হারা মেয়েটির চিকিৎসার জন্য সারাদিন পড়ে আছে হাসপাতালে৷
বাড়িতে বড় ছেলে নেই কেউ তাই রাহুল সবসময় সঙ্গেই রয়েছে৷ থাকবে নাই বা কেন? তার মনের গভীরে প্রথম ভালবাসার বীজ বোনা সেই রমণী আজ শরীরে এবং হৃদয়ে বিষ দংশনে ফালাফালা হয়ে গেছে৷ এ বিষ সমাজের মধ্যে মানুষের মুখোশধারী জানোয়ারদের বিষ৷ কখনো রাহুল বেডের পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে৷ নন্দিনীর বাবা মেয়েকে একটু সুস্থ দেখে আবার পুলিশ স্টেশনে দৌড়েছে বিচারের আশায়৷ ঘন্টাখানেক পর পুলিশকে সাথে নিয়েই ঢুকলেন৷ এবার শুরু হবে পুলিশি জেরা৷
—"তোমার নাম?"
চোখের জল তখনো গড়িয়ে পড়ছে নন্দিনীর৷ কখনো ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠছে৷ বাবা গিয়ে বসে মেয়ের পাশে৷ লজ্জায় দু হাতে মুখ ঢেকে নেয় নন্দিনী৷ পাশে বসে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেন..
—"কাঁদিসনা মা৷ আমি এখনো বেঁচে আছি, ওই শয়তানদের শাস্তি হবেই৷ তুই কোন চিন্তা করিসনা, তোর বাবা সবসময় তোর পাশে আছে৷ তুই সব খুলে বল পুলিশকে৷"
বাবার সামনে কিছু বলতে ইতস্ততঃ বোধ করছে৷ বুঝতে পেরে রাহুলকে সঙ্গে থাকতে বলে নিজে বেরিয়ে গেলেন ডাক্তারের সাথে কথা বলার অযুহাতে৷ একজন মহিলা পুলিশ আবার জিজ্ঞাসা করে...
—"কতজন ছিল ওরা?"
মুখ নিচু করেই উত্তর দেয়..
—"তিনজন৷"
—"কি নাম ছিল বলতে পারবে? এর আগে দেখেছ কখনো এই অঞ্চলে?"
—"না৷"
—"কখন হয়েছে?"
—"কাল সন্ধেবেলা, কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার সময়৷"
—"ওদের দেখলে চিনতে পারবে?"
ঘাড় নাড়িয়ে সম্মতিসূচক জবাব দিল নন্দিনী৷
—"ওরা কি গাড়ি নিয়ে ছিল?"
—"হ্যা, দুটো বাইক৷"
—"আচ্ছা তুমি সুস্থ হয়ে যাও৷ চিন্তা করবেনা, আমরা ওদের খুঁজে বের করবই৷"
এবার রাহুলকে বলে..
—"পুলিশ ওই জায়গার তল্লাশি চালাচ্ছে৷ কিছূ জানতে পারলেই আপনাদের জানান হবে৷ কাল সকালে এর বাবাকে থানায় আসতে বলবেন৷"
এই বলে পুলিশ বেরিয়ে গেল হাসপাতাল থেকে৷
সকাল প্রায় ১১:৩০ বাজে তখন বাড়ি থেকে নন্দিনীর কাকা আর সঙ্গে স্বপ্না দেখা করতে আসে, একঘন্টা থাকার পর বাড়ি ফিরে যায়৷
তখন বিকেল প্রায় ৪টে বাজে, হঠাৎ নন্দিনীর বাবার খেয়াল হল পাত্রপক্ষ তো নিজের সময়েই আসবে৷ তখন কি হবে? বাড়ির সম্মান নিয়ে সমাজের মানুষ কিৎকিৎ খেলতে ছাড়বে না৷ হাজার প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে৷ মেয়েটাকে কেউ ছেড়ে কথা বলবে না৷ নাঃ, নন্দিনীকে এখন বাড়ি নিয়ে যাওয়া চলবে না৷ এবার ফোন করে নিজের ভাইকে পরামর্শের জন্য৷
—"পাত্রপক্ষ তো কিছুই জানেনা৷ তুই ওদের এক্ষুনি ফোন করে বলে দে বিয়ে হবেনা৷"
—"কি বলছ দাদা! কত রকমের প্রশ্ন উঠবে তাহলে৷ ওরা তো এতক্ষনে বেরিয়েও গেছে মনেহয়৷ এভাবে বললে বাড়ির মান সম্মান সব নষ্ট হয়ে যাবে৷ আমারো একটা মেয়ে আছে দাদা, তার বিয়ের জন্য পাত্র পাওয়া যাবে পরে এরকম কিছু ঘটলে?"
—"তাহলে কি করা যায় তুই বল?"
—"আচ্ছা আমি বাড়িতে আলোচনা করে জানাচ্ছি৷"
প্রায় আধঘন্টা পর ফোনটা বেজে ওঠে নন্দিনীর বাবার৷
*** চতুর্থ পর্ব ***
শেষ পর্যন্ত বিয়েটা হয়ে গেল, শুধু কন্যের চরিত্রে স্বপ্না বসেছিল পিঁড়িতে৷ নন্দিনী বিয়ের পরের দিন যাবে ভাবল নিজের বাড়িতে, বাবা এসে যা শোনাল তার সারসংক্ষেপ হল — "ধর্ষনের জন্য ধর্ষিতাই দায়ী"৷ পাড়ার এক কাকিমা তো বলেই ফেলল..
—"তোমরা বাপু যাই বলনা কেন আমার তো প্রথম থেকেই সন্দেহ ছিল মেয়েটা নষ্টা, কই অন্য কারোর সাথে তো হয়নি৷ কী দরকার ছিল বিয়ের আগের দিন বাড়ির বাইরে যাবার৷"
এই কথার বিরুদ্ধে আর কোন কথা বলতে ইচ্ছে হয়নি তার বাবার৷ এ হেন অশিক্ষিত, অমানুষিক এবং অমানবিক মানুষের কথার উত্তর দিতেও বিবেকে বাঁধে৷ হাসপাতালে আর কদিন রাখা যায়? এবার তো এখান থেকে নন্দিনীকে নিয়ে যেতেই হবে৷ রাহুল সব পরিস্থিতি দেখে নন্দিনীর বাবার কাছে একটা প্রস্তাব দিল...
—"কাকু, যদি কিছু মনে না করেন আমি কি কিছু প্রস্তাব রাখতে পারি?৷
—"হ্যা, বল না বাবা, তোমার কথায় কিছু মনে করবে সে ধৃষ্টতা আমার মনের নেই৷ তুমি যা করেছ আমাদের জন্য তা তো আমার নিজের মানুষেরাও করেনি৷"
—"এভাবে বলবেন না৷ আমি আপনার ছেলের বয়সি৷ এ তো আমার কর্তব্য৷ মানুষ যদি মানুষের পাশে না দাঁড়ায়, তাকে মানুষ রূপে পরিচয় দিতে মনুষ্য জাতির লজ্জা হওয়া উচিৎ৷ আচ্ছা, কাকু নন্দিনী যদি আমাদের বাড়িতে কদিন গিয়ে থাকে.... বাড়িতে আমার বোন, মা সাবাই আছে৷ আমি মায়ের সাথে কথাও বলেছি৷ আর নন্দিনী যদি এখন আপনার সাথে বাড়ি যায় তবে পাড়ার লোকের কথার বিষদংশনে আরও ভেঙে পড়বে৷"
—"তা তো ঠিক, কিন্তু তা বলে তোমাদের বাড়িতে...."
—"ও নিয়ে একদম ভাববেন না৷ আমার বাড়িতে কোন অসুবিধে নেই৷ শুধু আপনি সংকোচ করবেন না৷ আমি নন্দিনীকে বুঝিয়ে বলছি৷"
বাথরুম যাবার জন্য উঠে কথাগুলো আড়াল থেকে শুনে ফেলল নন্দিনী৷ চোখ থেকে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল৷ প্রথম ফোঁটায় লেখা ছিল এমন সুন্দর হৃদয়ের এক বন্ধু পাবার জন্য ভগবানকে ধন্যবাদ৷ দ্বিতীয় ফোঁটায় সমাজের সেই মানুষগুলোর প্রতি ঘৃনা, যারা মুখ বেঁকায় ধর্ষক নয় ধর্ষিতাকে দেখে৷
অনেক সংকোচ কাটিয়ে শেষে নন্দিনী, তার বাবা আর রাহুল রওনা দিল রাহুলের বাড়ির দিকে৷ ট্যাক্সি স্ট্যান্ড থেকে ট্যাক্সিতে করে প্রায় কুড়ি মিনিটের রাস্তা৷ পৌছানোর আগেই রাহুলের মা দাঁড়িয়ে ছিল আপ্যায়নের জন্য বাড়ির বাইরে৷
রাহুলের বাড়িতে কেটে গেল বেশ কটা দিন৷ একদম বাড়ির মেয়ের মতো রয়েছে এখানে৷ রাহুলের মা কে নিজের মায়ের মতোই মনে করে নন্দিনী৷ আসলে মায়ের ভালবাসা সে তেমন পায়নি কী না, তাই৷ রাহুলের মায়ের তো নন্দিনীকে বেশ ভাললাগে৷ নন্দিনী এ বাড়িতে আসার পাঁচ দিনের মাথায় রাহুলের বাড়িতে একটা চিঠি এল৷ আন্দামানে চাকরির পরীক্ষাতে পাশ করেছে, তারই কল লেটার এসেছে৷ বাড়ির সবাই বেশ খুশি৷ ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষার একমাস পরেই এই পরীক্ষাটা ছিল৷ সরকারী বলে কথা, তাই বাড়িতে সেদিন সন্ধে বেলাটা বেশ ভালই কাটল৷ স্পেশাল আয়োজন ছিল রাত্রের খাবারে, মটন, পোলাও৷
আজ স্বপ্নার অষ্টমঙ্গলা, বাপের বাড়ি আসবে৷ নন্দিনীকে ফোন করেছিল, শুধু দেখা করা বা তার খবর নেবার জন্য নয়, বাড়িতে দেখা করে নিজের বড়লোক স্বামী আর শ্বসুরবাড়ির গুণগানের জন্য৷ ওই যাতে একটু খোঁটা দিয়ে গায়ের জ্বালা মেটে তার জন্য৷ নন্দিনী তবুও যাবে দেখা করতে৷ বোন বলে কথা৷ নন্দিনী বেরোবার আগে রাহুলের মা বললেন...
—"আমি তোকে আজীবন আমার মেয়ে করে রাখতে পারলে খুশি হব৷"
এ কথার মানে বোঝার মত যথেষ্ট বয়স নন্দিনীর হয়েছে৷ যাই হোক এবার নিজের বাড়ি যাবার পালা৷
বাড়িতে পৌছে দেখে স্বপ্না ততক্ষণে এসে গেছে৷ কেউ কিন্তু কোন খারাপ ব্যাবহার বা কটাক্ষ করেনি এখনো৷ একই বিছানায় বসে দুই বোন মিলে বেশ গল্প চলছে৷ এমন সময় কাকিমা পাশের ঘর থেকে ডাক দিল স্বপ্নাকে৷ স্বপ্না বলে গেল..
—"তুই এখানেই থাক, আমি আসছি এক্ষুনি৷"
কথা বলার সময় কেন যে বার বার চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছে স্বপ্না, ঠিক বুঝতে পারছে না নন্দিনী৷ এ কী এক ধর্ষিতা বোনের প্রতি দয়া বা করুণার প্রভাব!!
পাশে পড়ে থাকা মোবাইলের আলোটা জ্বলে উঠল৷ স্বপ্নার মোবাইল, বিছানায় ফেলেই চলে গেছে৷ পর পর চার বার মেসেজ টোন বেজে উঠল৷ হঠাৎ মোবাইলটা হাতে নিতেই Whats app এর মেসেজের সাথে সেই খুব চেনা জঘন্য একটা চেহারা দেখতে পেল নন্দিনী, যে সেদিন রাত্রে প্রথম নন্দিনীর শরীরে বিষ ঢেলেছিল৷
গা টা রি-রি করতে লাগল৷ ঘৃনায়, অপমানে, রাগে, ক্ষোভে ফেটে পড়তে লাগল হৃদয়টা৷ মেসেজ খুলে পড়তে গিয়ে দেখে...
"ম্যাডাম, তোমার প্রেমের প্রতিশোধ তো নিলে, আমার বাকি পাঁচ হাজারটা আজই লাগবে৷ কথামতো ঠিক অষ্টমঙ্গলার দিনেই যোগাযোগ করলাম৷"
আর ঠিক থাকতে পারল না নন্দিনী৷ নিজের মোবাইল থেকে মেসেজের একটা ফটো তুলে রাহুলকে পাঠিয়েই সঙ্গে সঙ্গে ফোন...
—"হ্যালো, রাহুল, আমাকে নিয়ে যা এসে বাড়ি থেকে, এক্ষুনি"...
✍ প্রভাত...
ভিভা নামের মেয়েটি ( সত্য ঘটনা অবলম্বনে )
কাল পয়লা বৈশাখ৷ ছুটি নিয়েছি কাল অফিসে৷ আজ সপ্তাহের শেষ দিনে ডিউটি করে অটো ধরে সোজা বিধান নগর স্টেশন৷ টিকিট কেটে উঠলাম গঙ্গাসাগর এক্সপ্রেসের জেনারেল কামরায়৷ ভীড় মোটামুটি, বসার জায়গা না পেয়ে দাঁড়িয়েই রইলাম৷ অভ্যাসবশতঃ মোবাইলটা দেখতে দেখতে দুই বিহারি লোকের কথোপকথন শুনে ভাবলাম গল্পটাই শোনা যাক৷ অতঃপর মোবাইল পকেটে রেখে চুপ করে দাঁড়িয়ে শুনতে লাগি৷ গোপন কোন কথা হলে শুনতাম না৷ প্রথম ব্যাক্তি বেশ গর্বের সাথেই বলছিল গল্পটা৷ (বাংলায় অনুবাদ করেই বলি)
— "পশ্চিম বাংলায় হেব্বি মাল আছে ভাই৷ সচরাচর দেখলে বোঝা যাবে না এরকম৷ "
— "তাই নাকি? তা কি রকম?"
— "এই দেখ ওর ফোন ঢুকছে৷"
দেখতে পেলাম মোবাইল স্ক্রিনে একটি নাম ফুটে উঠল, ভিভা৷ প্রথম ব্যাক্তি বারবার ফোন কেটে দিয়ে গল্পে মন দিল, এমন ভাবে বলছে যেন কোন আর্মি অফিসার পাকিস্তান জয় করে ফিরেছে৷
এবার ফোন থেকে একটি সেলফি তোলা ফটো বের করে....
— "এই দেখ, কেমন মালটা? একেই কদিন ধরে হেব্বি....."
— "বাহঃ ভাই, ব্যাপক তো! কিভাবে, কোথায় পেলে?"
—"কেন? দেখেই গড়াচ্ছে মনে হচ্ছে...হুমমম...!!"
— "তা হেব্বি জিনিস পেলে কলকাতায় এসে৷ এত ফোন করছে কেন? ও কি জানেনা তুমি বিবাহিত?"
— "আরে নাঃ, সে জানতেও চায়নি, আমিও কী আর বলি...৷ এই কদিন আমি যেখানে ছিলাম সেখানেই পরিচয় ওর সাথে৷ বোলপুর থেকে এসেছিল রাম নবমীর একটা প্রোগ্রামে গাইতে৷"
— "আচ্ছা.... তারপর..."
—"পরিচয় হল একদিন৷ ও ভেবেছে আমি সিঙ্গেল৷ আমিও বেশি কিছু বলিনি৷ দুদিন কথা বলতেই উঠে গেল৷ একদিন ঘুরতে গেলাম সেন্ট্রাল পার্ক৷ তার পরের দিন এক বন্ধুর ফ্ল্যাটে৷ ব্যাস...."
আর পারলাম না শুনতে৷ রাগে, ঘেন্নায় গা টা রি রি করতে লাগল৷ ভিভা নামের মেয়েটি যাকে বিশ্বাস করল সেই কিনা শেষে বিশ্বাস ঘাতক!
আর কোনদিন দেখা করবে না সে ভিভার সাথে৷ তবুও হয়তো এক স্বপ্নের ভবিষ্যতের আশায় বুক বেঁধেছিল তার হৃদয়৷ জানত না, তার ভালবাসা এক সস্তা রগরগে গল্পেই পরিনতি পাবে৷ এখনো ভাবছি আর লিখছি, দোষ কার? শুধু লোকটির... নাকি ভিভারও?...
✍ প্রভাত ঘোষ...
সাগরের আর্তনাদ
সন্ধে বেলায় প্যারেড শেষে এক সহকর্মির ডাক..
— "সাগর, তুমকো মেজর সাব বুলায়া হ্যায়৷ তুমহারা ছুট্টি মন্জুর হো গয়া৷"
ছুট্টে যায় সাগর মেজরের অফিসের দিকে৷ দুদিন আগেই দরখাস্ত দিয়েছিল, এত জলদি মন্জুর হবে ভাবেনি৷ তবু আশা ছিল৷ যেতে তো তাকে হবেই, বাবার শরীর খুব খারাপ যে৷
দক্ষিন চব্বিশ পরগণার সুদূর সাগরদ্বীপে বাড়ি৷ সেই ছাব্বিশ বছর আগে এক সন্তানহীন ধীবর তাকে কুড়িয়ে পায় সাগর পাড়ে৷ তাই নাম দেয় সাগর৷
অনেক কষ্টে তার বাবা মানুষ করেছে তাকে৷ রোদ, ঝড় জল উপেক্ষা করে নৌকোয় করে মাছ এনে বিক্রি করে ছেলের পড়ার খরচের যোগান দিয়েছে সে পিতা৷ তাইত সাগর সংসারের দুর্দশা ঘোঁচাতে কলেজ শেষ করেই যোগ দেয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীতে৷
সেই পিতা আজ অসুস্থ হয়ে বিছানায় শয্যাশায়ী৷ সে কিছুতেই পারবেনা সেই দেবতা সম পিতাকে এ হেন অবস্থায় ফেলে সুদূর অসমে ডিউটি করতে৷
ছোটবেলা থেকেই জলের প্রতি অগাধ মোহ৷ সাঁতারে তো খুব পটু ছিল প্রথম থেকেই৷ গাঁয়ের অনেকে বলত এ যেন সমুদ্রেরই সন্তান৷ সাঁতারের কত যে কায়দা তার জানা, আর সেজন্যই তো স্পোর্টস কোটায় পেয়ে গেল চাকরিটা৷
যাই হোক পনের দিনের ছুটি নিয়ে পরদিন ভোরের ট্রেন ধরল৷ দেড়দিন পর ট্রেনে ট্রেনে পৌছোল নামখানা স্টেশনে৷ তখন প্রায় দুপুর দুটো৷ স্টেশনে নেমেই গোপালদার দোকানে এক কাপ চা খেয়েই আবার রওনা৷ টোটো ধরতে হবে লঞ্চঘাটে যাবার জন্য৷ মিনিট পনেরোর মধ্যেই ঘাটে এসে লঞ্চে চেপে ব্যাগ দুটো রেখে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে পড়ল৷ গঙ্গার এই স্নিগ্ধ বাতাস কতদিন তার গায়ে লাগেনি৷ চল্লিশ মিনিটের লঞ্চ যাত্রায় কৈশোরের স্মৃতি একবার ফের ঝালিয়ে নিল৷ নেমেই আবার ম্যাজিক ভ্যান ধরে সোজা সাগরদ্বীপ৷
গ্রামে প্রায় ন-মাস পরে এল সাগর৷ কত কী পাল্টে গেছে, ঢালাই রাস্তা, রাস্তার ধারে ধারে ত্রিফলা ল্যাম্পপোষ্ট, মন্দিরের সামনে টাইলস বসানো, হাওয়া কল বসেছে৷ বাহঃ, বেশ উন্নতি হয়েছে গ্রামের৷
বাড়িতে ঢুকেই মায়ের সে কত আদর, বাপটা যেন প্রাণ ফিরে পেল সাগরকে দেখে৷ মায়ের কথা যেন আর শেষই হয়না...
— "জানিস তোর বাবা তোর পাঠান টাকা জমিয়ে একটা বড় জেটি কিনেছে৷ ওই ছোট্ট ডিঙিটা নিয়ে মাছ ধরতে বেশি দূর তো আর যেতে পারত না৷"
— "আচ্ছা মা ওই ডিঙিটা কোথায় আছে? বিক্রি করে দেয়নি তো?"
— "তোর সাধের ডিঙি কি আর বিক্রি করতে পারে তোর বাবা? ওটা মেরামত করে পাড়েই রাখা আছে৷"
কিছু খাবার খেয়ে ভাবল একবার সমুদ্রের পাড় থেকে ঘুরে আসা যাক৷ মেঘটাও বেশ কালো হয়ে আছে, বৃষ্টি নামতে পারে৷ তা নামুকগে, গাঁয়ের রাস্তায় কতদিন হল বৃষ্টিতে ভেজেনি৷ আজ নাহয় ভিজলামই একটু৷ এই ভেবে বেরিয়ে পড়ল সাগর সাগর পাড়ের দিকে হাঁটতে হাঁটতে৷ হাওয়া বেশ ভালই চলছে বাইরে, আস্তে আস্তে আরও বাড়তে লাগল৷ পাড়ের কাছাকাছি চলে এসেছে সেই সময় স্বপনদার সাথে দেখা৷
— "আরে, সাগর লয় ? হঅঅ, ঠিক চিনেছি৷ কবে আসলি? তুই ত মস্ত অফিসার হইয়ে গেছিস৷ চেহারাটাও ভালই হইয়েছে৷"
—"এই তো একটু আগেই গাঁয়ে ঢুকলাম৷ ভাবলাম একবার পাড়ের দিকে ঘুরে আসি৷ তুমি কেমন আছ?"
— "আমাদের আর কেমন চইলবে, ওই চইলে যাচ্ছে মাছ বিক্রি করেই৷ দেখনা একটু আগেই খবরে বলল কদিন খুব ঝড় জল হবেক৷ মাছ ধরতে যাওয়াও বন্ধ কদিন কে জানে৷"
কথায় কথায় বেশ জোরে ঝড় শুরু হল৷ দুজনে দৌড়ে গিয়ে দাঁড়াল একটা চা দোকানে৷
দুদিন ধরে খুব বৃষ্টি, ধীবর প্রজাতির সমুদ্রে মাছের সন্ধান বন্ধ৷ কাহাতক আর ঘরে সারাদিন বসে থাকা যায়, তাই সাগর আবার সেই সমুদ্রের পাড়ের দিকে ছাতা নিয়ে বেরোল৷ পাড়ে এক দোকানে চা খেতে খেতে রেডিওতে খবর...
" বঙ্গোপসাগরে মোহনার নিকট একটি যাত্রি বোঝাই ছোট জাহাজ বিপদগ্রস্থ অবস্থায় আছে৷ সন্দেহ করা হচ্ছে কোন কারনে জাহাজে ফাটল ধরার কারনে জল ঢুকতে শুরু করেছে৷
উদ্ধার কার্যের জন্য একটি বিশেষ দল গঠন করা হয়েছে৷ দলটি কিছুক্ষণ আগেই সাগরদ্বীপের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে৷ মৎস্যজীবিদের অনুরোধ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় সমুদ্রে যাবেন না৷"
খবর শুনেই সাগরের মনে উঠল ঝড়৷ এ ঝড় সামুদ্রিক নয়, মানসিক৷ এত কাছে থাকা সত্ত্বেও সে কি কিছুই করতে পারবেনা ওই গভীর সমুদ্রের নিষ্পাপ যাত্রিদের জন্য ? তার এত ট্রেনিং, সাঁতার প্রতিযাগীতার চ্যাম্পিয়ন হওয়া, দেশের মানুষের জন্য জীবন উৎসর্গ করার শপথ, সবই কি ব্যার্থ হয়ে যাবে? না, উদ্ধার কার্যে যেতেই হবে৷ মানসিক ভাবে সম্পূর্ন প্রস্তুত সাগর৷ মুখের সিগারেটটা শেষ করেই পাশে বসে থাকা বিকাশ দা কে বলল...
—"বিকাশ দা আমাদের ছোট জেটিটা কোথায় রাখা আছে জানো?"
—"হ্যা, ওই তো একটু এগিয়ে গিয়েই একটা গাছে বাঁধা আছে৷ কিন্তু এই ঝড় জলে জেটি নিয়ে কি করবি?"
—"শুনলে না, কাছাকাছি কোথাও একটা জাহাজ খুব বিপদে পড়েছে, কত লোক আছে৷ জাহাজে নাকি জল ঢুকেছে৷ একজন সৈনিক হয়ে এতগুলো লোকের বিপদ শুনেও চুপ করে বসে থাকব? না, তা হয়না বিকাশ দা৷ আমাকে যেতেই হবে৷"
—"বোকামি করিসনা সাগর, সমুদ্র ফুঁসছে এখন৷ তুই ছোট জেটি নিয়ে একা কিভাবে এত মানুষকে বাঁচাবি?"
—"একজনকে হলেও তো পারব৷ সেখানেই আমার এত বছরের ট্রেনিং, সাঁতারে মেডেল, এগুলো সার্থকতা পাবে৷ তোমার মনে আছে, তুমি সেবার আমার সাথে জেলার সাঁতার প্রতিযোগীতায় তৃতীয় হয়েছিলে, আর আমি চ্যাম্পিয়ন৷ তারপর তুমি স্কুল মাস্টারের চাকরি নিয়ে গাঁয়েই রয়ে গেলে৷"
—"হ্যা রে, খুব মনে আছে৷ আমার সেই সাঁতার আর কোন কাজেই লাগেনি৷ শুধু একটা সার্টিফিকেট কোথায় যে ফাইল বন্দী হয়ে পড়ে আছে....."
—"আজ কাজে লাগতে পারে বিকাশ দা৷ তুমি যাবে আমার সাথে জেটি নিয়ে? তুমি চালিও, আমি উদ্ধার করব৷"
—"কিন্তু....."
—"আর কোন কিন্তু নয় বিকাশ দা৷ মানুষগুলোর খুব প্রয়োজন আজ তোমাকে৷ "
—"চল্ তাহলে, দেখা যাবে যা আছে কপালে৷ বিয়ে থা ও করিনি এখনো, মরলে মরব দেশের মানুষের জন্য৷ চল্ ..... "
সামনের দোকানে রাখা দশ লিটারের পেট্রোলের জারটা উঠিয়ে দৌড় দিল জেটির দিকে৷ পেছন ফিরে একবার বলল সাগর....
—"ঘনা দা, জারটা নিয়ে গেলাম......"
শেষ শব্দগুলো আর শোনা গেল না সমুদ্রের বিশাল আর্তনাদের মাঝে৷
জেটি চলছে সমুদ্রে, ছোট বেলার আলিফ লায়লার কথা মনে পড়ে গেল সাগরের৷ সিন্ধবাদ এভাবেই তার জাহাজ নিয়ে সমুদ্রের মাঝে.....
হঠাৎ দেখে এক ক্ষীণ লাল আলো ভরা সমুদ্রে যেন বিপদের সংকেত দিচ্ছে৷
—"বিকাশ দা, ওই দেখ পশ্চিম দিকে জাহাজের লাল আলো জ্বলছে ওই দিকে চালাও জেটি৷"
জেটি তখন প্রচন্ড দুলছে৷ তবু এগিয়ে চলল বিকাশ৷ জেটি চালাতে সে ভালই জানে, বাবার সাথে আগে অনেকবার বেরিয়েছে সমুদ্রে মাছ ধরতে৷ জাহাজের সাথে আস্তে আস্তে দূরত্বটা কমছে কিন্তু কারও চিৎকার তো শোনা যাচ্ছেনা৷ জাহাজের সাইরেনও শুনতে পাচ্ছেনা৷ ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারল না সাগর৷ আরও একটু যেতেই বোঝা গেল বিপদের ভয়াবহতা৷ ওখানে ঘুর্ণী উঠেছে, হয়ত এ কারনেই যন্ত্র বিকল হয়ে আর এগোতে পারছে না৷
—"বিকাশ দা, আর একটু আছে, কাছে এসে গেছি প্রায়৷"
—"আর খুব বেশি সামনে যাওয়া যাবেনা মনে হচ্ছে রে৷ সামনে ঘূর্ণী দেখতে পাচ্ছি৷ থেমে গেলে কাছে যাওয়া যাবে৷"
সাগর নিরূপায় হয়ে সময় গুনতে লাগল৷ কিছুক্ষন পর মনে হচ্ছে ঘূর্ণীঝড় তার দিক পরিবর্তন করেছে৷
—"বিকাশ দা, এবার চল সামনে৷ ঘূর্ণী পূর্বদিকে যাচ্ছে৷"
জেটি এবার সবেগে চলতে লাগল, কিন্তু একি জাহাজ তো প্রায় ডুবতে বসেছে৷ কিন্তু কোন লোক নেই কেন? সন্ধে হয়ে আসছে, দশ শেলের টর্চ টা বের করল সাগর৷ সমুদ্র তখনো ফুঁসছে৷ টর্চের আলোয় কয়েটা হাত জলের মধ্যে দেখতে পেল, শুনতে পেল বাঁচাও বাঁচাও৷ জাহাজটা এবার ডুবে গেছে অনেকটাই৷ অারও কাছে আসতেই দেখল অনেকগুলো মানুষ ভয়ে আগেই ঝাঁপ দিয়েছে জলে৷ বিকাশ এবার ভেতর থেকে ডাক পাড়ল...
—"আর সামনে যাওয়া যাবেনা৷ জাহাজটা ডুবছে, আর সামনে গেলে আমরাও ডুবে যাব৷"
কথাটা শুনেই সাগর জেটিতে গুটিয়ে রাখা দড়িটা খুলল, সঙ্গে দুটো টিউব নিয়ে বলল...
—"আমি ঝাঁপ দিলাম৷ তুমি জেটিটাকে এখানেই দাঁড় করিয়ে রাখ৷ দড়িটা বাঁধা আছে৷ ভয় পেওনা....."
বলেই এক নিমেষে ঝাঁপ দিল সাগর৷ বিকাশ ভাবছে এই ভরা সাগরে ঝাঁপ দিল সাগর নিজে, আর তাকে বলে গেল ভয় না পেতে! এজন্যই হয়ত ওদের জওয়ান বলে, নিজের জীবন বাজি রাখার আগেও অন্যকে অভয় দেয়, সত্যি আজ একটা স্যালুট করতে মন যাচ্ছে এরকম লক্ষ লক্ষ জওয়ানদের৷
সাগর এগিয়ে চলেছে সাঁতরে, কোমরের বেল্টে বাঁধা দড়ি, একটা টিউব সেই দড়িতে বাঁধা আর একটা তার হাতে৷ দেখতে পাচ্ছে জাহাজের অবশেষ অংশও ডুবে গেল সশব্দে, সঙ্গে না জানি কত মানুষ তলিয়ে গেল সমুদ্রের গভীরে৷ তবুও সে হাল ছাড়বে না৷ সাঁতরাতে সাঁতরাতে সামনে দেখল একটা মানুষ কিছু একটা ধরে ভেসে থাকার চেষ্টা করছে আর হাত বাড়িয়ে চিৎকার করছে৷ আরও কিছুটা সাঁতরে যেতেই এক নারীকন্ঠ...
—"বাঁচাও.... বাঁচাও...."
ঢেউ তখনো আসছে বেশ বড়ই৷ জাহাজের পাটাতনের একটা ভাঙা অংশ নিয়ে কোনমতে ভেসে আছে, শুধু মাথাটা জলের ওপরে আর দুটো দিয়ে শক্ত করে পাটাতন ধরে প্রাণটি এখন মৃত্যুর সম্মুখে৷ ডুবে যাওয়া জাহাজের থেকে একটু দূরে থাকায় এ যাত্রায় বেঁচে গেছে৷
সাগর টিউব নিয়ে পৌছোয় মেয়েটির কাছে৷ কোমরে বাঁধা দড়ির সাথে লাগানো টিউবটা দড়ি সমেত খুলে গলিয়ে দেয় মাথার ওপর থেকে৷ যাক এবার আর ডোবার ভয়টা নেই৷ টিউব সমেত মেয়েটি জড়িয়ে ধরে সাগরকে, যেন ওপরওয়ালা এই ভয়ঙ্কর দুর্যোগের উত্তাল সমুদ্রে কোন দূত পাঠিয়েছেন তার জীবন বাঁচাতে৷ সাগর আবার সেই দৃঢ় জওয়ানের ভাষায় বলল...
—"ভয় পাবেন না, আমি আছি৷ টিউবটা শক্ত করে ধরে থাকুন৷ একটা লম্বা দড়ি বাঁধা আছে ওটার সাথে৷ আমাদের জেটি একটু দূরেই দাঁড়িয়ে আছে৷"
মেয়েটি ভয়ে তখনো সাগরের হাত ছাড়েনি৷ সাগরের চোখ তখনো খুঁজছে যদি আরও কেউ বেঁচে আছে, যদি উদ্ধার করা যায়৷ নাঃ, আর কারও আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না৷ তবে কি শুধু এই মেয়েটিই বেঁচে আছে এত মানুষের মধ্যে? এতগুলো মানুষকে চোখের সামনে মরতে দেখেছে মেয়েটা! সেই মৃত্যুর বিভিষিকার ভয়ঙ্কর ছবি যেন ভয়ে মুষড়ে দিয়েছে৷ ছোট বড় ঢেউ আসছেই অবিরত৷ বৃষ্টি এখনো পড়ছে মুষলধারেই৷ দড়ি ধরে ধীরে ধীরে সাঁতরে এগোতে লাগল মেয়েটি জেটির দিকে৷ সাগর নিজের টিউবটা মাথা দিয়ে গলিয়ে ভেসে থাকা পাটাতনটা দু হাত দিয়ে ধরে সাঁতরে যেতে লাগল মেয়েটির পাশে পাশেই৷
হঠাৎ একটা বড় ঢেউ, মেয়েটি ভয়ে চিৎকার করে উঠল৷ সাগর সামনে গিয়ে আবার ধরল তার হাতটা৷ দড়িটা বাঁধাই আছে মেয়েটির টিউবের সাথে৷ আবার একটা বড় ঢেউ৷ দুজনেই বেশ কিছুদূর ভেসে গেল ঢেউয়ের সাথে৷ দড়িটা ধরে টানতে গিয়ে আতঙ্কিত স্বরে সাগর অস্ফুটে বলে উঠল...
—"একি! দড়িতে টান লাগছে না কেন?"
এবার আরও ভয় পেল মেয়েটি৷
—"কি!! দড়ি কি ছিঁড়ে গেছে? এবার কি হবে?"
ভয়ে সাগরকে শক্ত করে ধরে কাঁদতে লাগল৷ ঢেউ তাদের অনেক দূরে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে৷ জেটি থেকে অনেক দূরে৷ সন্ধে হয়ে গেছে৷ মাঝ সমুদ্রে জেটির আলো বেশ ক্ষিন হয়ে এসেছে৷ দড়িটা প্রায় সাতশো মিটার লম্বা৷ তাই বেশ দূরেই চলে এসেছে এটা বেশ ভালই বুঝতে পারল সাগর৷ হঠাৎ মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল৷ দড়িটা টানতে লাগল সাগর৷ এবার পাটাতন কে অনেক কষ্টে টিউব দুটোর সাথে বাঁধল৷ পাটাতনের ওপরে এবার বসলেও ডুববে না৷ দুজনের ভারও নিয়ে নেবে৷ মেয়েটিকে ওপরে বসিয়ে দিল, নিজে পাটাতন ধরে জলে ভেসে রইল৷ এবার সাঁতার কেটে পাটাতন সমেত জেটির কাছে পৌছোতে হবে৷ সময় প্রায় এক ঘন্টা অতিক্রান্ত৷ বিকাশ জেটিতে বসে কি ভাবছে কে জানে৷ এ কি!! জেটি অন্যদিকে যাচ্ছে কেন? নাকি এতক্ষন হয়ে গেছে বলে বিকাশ খোঁজার জন্য জেটি ঘোরাচ্ছে? হায়!!! আর হয়তো খুঁজে পাবেনা বিকাশ৷ সমুদ্রের মাঝে দিক নির্ণয় করাও বড় মুশকিল৷
হতাশ হয়ে পড়ে সাগর৷ এবার পাটাতনে উঠে বসে বলে...
—"এখন আর কোন উপায় নেই৷ রাতটা এভাবেই কাটাতে হবে৷ অনেকটা দূরে চলে এসেছি আমরা৷ ঢেউটা এখন কম এটাই বাঁচোয়া৷ তবে মাঝ সমুদ্রে ঢেউ খুব বেশি থাকেনা৷ আপনি ভয় পাবেন না, আমি একজন ফৌজি৷ আমি বেঁচে থাকতে আপনার কিছু হতে দেবনা৷"
মেয়েটির মুখে কোন কথা নেই৷ চোখের সামনে তলিয়ে যাওয়া জাহাজ, মানুষের মৃত্যুর পূর্বের আর্তনাদ, শেষ আশার জেটি ছেড়ে চলে যাওয়া, সমুদ্রের বিশাল ঢেউয়ের ভয়াবহতা বাক্ শক্তি কেড়ে নিয়েছে৷ এখনো শক্ত করে ধরে আছে সাগরের হাত৷
রাত এভাবেই কাটলো, যেন কয়েক বছরের সমান সময়৷ ভোরের আলো দেখা যাচ্ছে এবার৷ সমুদ্রের ঢেউ কতদূরে নিয়ে এসেছে কে জানে?
সাগর চারিদিকে দেখতে লাগল৷ বলে উঠল..
—"দূরে অনেকগুলো গাছ বা জঙ্গল দেখা যাচ্ছে৷ তার মানে ওখানে চড়া আছে৷ হয়তো বা কোন দ্বীপ আছে ওখানে৷"
—"চল তাহলে ওদিকেই৷"
মেয়েটির গলার স্বরে তখনো ভয়াবহতার চিহ্ন স্পষ্ট৷ সাগর বলল..
—"আপনি ওদিক থেকে জল ঠেলুন, আমি এপাশ থেকে ঠেলছি৷ ঠিক যেভাবে নৌকোর দাঁড় টানে৷"
বৃষ্টি তখনো হালকা হালকা পড়ছে৷ দুজনে সেই ভেজা অবস্থায় জল ঠেলতে লাগল৷
প্রায় দু ঘন্টার পরিশ্রমের পর দেখল অনেক কাছাকাছি এসে গেছে৷ এবার জলে নামলে পায়ে মাটি পাওয়া যাবে৷ সাগর নামল এবার পাটাতন থেকে, নেমে ঠেলতে লাগল৷ অবশেষে এক নির্জন দ্বীপে এসে পড়ল দুজনে৷ নেমেই দৌড়োতে লাগল মেয়েটি কোন বড় গাছের উদ্দেশ্যে৷ এই বৃষ্টিতে আর কিছুক্ষন ভিজলে নিউমোনিয়া অবশ্যম্ভাবী৷ সাগর পেছন পেছন টিউব সমেত পাটাতনটা পাড়ে নিয়ে এল৷
বৃষ্টি থামল কিছু পরেই, মেঘের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে রোদ৷ দুজনেরই সর্বাঙ্গ ভেজা৷ একটা আস্তানা খুঁজতেই হবে৷ সাগর বলল...
—"আপনি এখানেই দাঁড়ান, আমি চারিদিকটা একটু দেখে আসি, যদি কোথাও কোন মাথা গোঁজার ঠাই মেলে৷"
—"আমিও যাব আপনার সাথে৷ আর আমার নাম তৃষা৷ তুমি করেই বলতে পারেন৷ আপনাকে অনেক ধন্যবাদ এভাবে আমাকে বাঁচানোর জন্য৷"
—"এটা আমার কর্তব্য, আমি একজন জওয়ান৷ আচ্ছা চলো এবার৷ তোমার কাপড় সব ভেজা৷ এভাবে থাকলে শরীর খারাপ হয়ে যাবে৷"
—"আপনারও তো সব ভেজা৷"
—"আপনি না, আমাকেও তুমি বলতে পারো৷ আমার নাম সাগর৷"
দুজনে জঙ্গলের মাঝে হাঁটতে লাগল৷ একটা নির্জন দ্বীপ, চারপাশে সমুদ্র, এখানে শুধু নানান রকম গাছ আর পাখি ছাড়া কিচ্ছু দেখা যাচ্ছেনা৷ এক ঘন্টার বেশি ঘুরেছে তারা এখানে, কোন বাড়ি, ঘর বা নিদেন পক্ষে একটা ঝুপড়িও নেই৷ সাগর জানে এই অবস্থায় কি করা দরকার৷ ফৌজির ট্রেনিংয়ে এ সব শেখান হয়৷ কিছু ইউক্যালিপটাস, আর কিছু খেজুর গাছের ডাল ভাঙল৷ এবার সামনে একটা বড় বট গাছের ঝুরির সাথে বেঁধে দুটো আলাদা ছোট্ট ঝুপড়ি তৈরি করে তৃষাকে বলল...
—"তুমি ওই ঝুপড়িতে ঢুকে সালোয়ারটা ভালো করে নিঙড়ে ঝেড়ে তারপর পরে নাও৷ জল ঝড়ে গেলে এই সমুদ্রের হাওয়ায় দশ মিনিটেই শুকিয়ে যাবে৷ এখন আবার রোদও উঠেছে একটু৷ আমিও এই পাশের ঝুপড়িতে আমার কাপড়গুলো নিঙড়ে নিই৷"
তৃষা ইতস্ততঃ বোধ করতে লাগল৷ তবু কেমন যেন একটা বিশ্বাস জন্মেছে সাগরের প্রতি৷ যে মানুষটা নিজের জীবনের পরোয়া না করে তার জীবন বাঁচাতে পারে, সমুদ্রের মাঝে ভয়ঙ্কর দুর্যোগে একটা পাটাতনে বসে সারারাত কাটাতে পারে, নিজের ঘর ছেড়ে তার জন্য এই নির্জন দ্বীপে ঝুপড়িতে থাকতে পারে, তাকে আর যাই হোক অবিশ্বাস করা যায়না৷ এ মানুষ তো ভগবানের দূত হয়ে এসেছে৷ ভাবতে ভাবতে তৃষা একটা ঝুপড়িতে ঢুকে যায়৷ দুজনে দুটি পাশাপাশি ঝুপড়িতে কাপড় শুকানোর মাঝে কথাও বলছে একে অপরের সাথে৷ সাগর কথা বলছে এমন সময় তৃষার কোন উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না৷ বেশ কয়েকবার ডাকল৷ নাঃ, কোন সাড়া নেই৷ একবার কি বেরিয়ে গিয়ে দেখবে? না, কি অবস্থায় আছে কে জানে৷ সন্দেহবশতঃ বেরিয়ে দেখল তৃষার ঝুপড়ির ওপরে সালোয়ারের ওপরের অংশ শুকোতে দেওয়া৷ আবার ডাকল..
—"তৃষা.... তৃষা....."
নাঃ, কোন শব্দ নেই৷ এবার ঝুপড়িতে একবার উঁকি দিতেই দেখল ঝুপড়ির মাঝ বরাবর বট গাছের শক্ত ঝুরিটায় শরীরটা এলিয়ে দিয়ে ঘুমোচ্ছে তৃষা৷ অন্তর্বাস খোলা পিঠ দেখা যাচ্ছে৷ এ কি করছে সে? এভাবে কোন মেয়েকে অর্ধনগ্ন অবস্থায় দেখা তার ঠিক হয়নি৷ এই সব সাতপাঁচ ভাবছে ঠিক সেই সময় তৃষার ঘুম ভেঙে যায়৷ সাগরকে দেখেই চিৎকার করে ওঠে....
—"এ কি তুমি ! আমাকে এভাবে দেখলে তুমি? এদিকে কেন এসেছ? "
পেছন ঘুরে দুহাত দিয়ে নিজের দেহ ঢাকার চেষ্টা করে৷ সাগর এবার শুকান সালোয়ারটি হাত দিয়ে বাড়িয়ে বলল...
—"সরি, সরি, আমি চাইনি তোমার এদিকে আসতে৷ কিন্তু অনেকবার ডাকলাম তোমায়, কোন সাড়া না পেয়ে... আই এম ভেরি সরি..."
পেছনে হাত বাড়িয়ে সালোয়ারটা নিয়ে তৃষা বলল ...
—"ওহ, আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম৷ ইটস ওকে, তোমার কোন দোষ নেই৷"
সাগর অপরাধবোধে দূরে গিয়ে পিছন ফিরে দাঁড়ায়৷ কিছুক্ষন পর তৃষার ডাক...
—"সাগর, আমার খুব ক্ষিধে পেয়েছে৷"
মৌনতা ভেঙে সাগর বলল...
—"এই জঙ্গলে কিছু খাবার পাওয়া যাবে বলে তো মনে হচ্ছে না৷ আমারও বেশ ক্ষিধে পেয়েছে৷ মনে হচ্ছে দুপুর প্রায় দুটো বাজবে৷ দেখি কোন ফল পাই কি না এই জঙ্গলে৷"
বেশ কিছুক্ষন পর সাগর ফিরে এল বেশ কিছু খেজুর, আধ পাকা আম নিজের গেঞ্জির মধ্যে বেঁধে৷ তৃষাকে সব দিয়ে বলল...
—"খাবার তো পাওয়া গেল, এখন খাবার জলেরও ব্যবস্থা করতে হবে৷"
—"এখানে কোথায় খাবার জল পাবে? সবই তো সমুদ্রের নোনা জল৷"
—"ওই যে দেখছো নারকেল গাছ, ওখান থেকে৷"
—"তুমি এত বড় গাছে উঠতে পারবে?"
কথাটা শেষ হবার আগেই সাগর হাঁটা দিল নারকেল গাছের দিকে৷ প্রায় আধঘন্টা পরিশ্রমের পর ফিরল দু হাতে চারটে ডাব নিয়ে৷ ফল খেয়ে, পাথরের ঘায়ে ডাব থেকে জল বের করে যেই জল পান করে বেশ তৃপ্তি পেল দুজনেই৷ বিকেল হয়ে গেছে৷ মেঘ এখনো বেশ আছে আকাশে৷ যেকোন সময় বৃষ্টি নামাও অস্বাভাবিক নয়৷ এই সময় এই দ্বীপে কোন জাহাজ বা ডিঙি আসার সম্ভাবনা কোনভাবেই নেই৷ আজ রাতটা এখানেই কাটাতে হবে মনে হচ্ছে৷ এখানে সাপ বা অন্য কোন জন্তুর আগমন হতেই পারে যেকোন সময়৷ তবুও আজ রাত্রে এভাবেই ঝুপড়িতে কাটানো ছাড়া উপায় নেই৷ আজ সারাদিন তৃষার সাথে গল্প করতে করতে বেশ বন্ধুর মতো হয়ে গেছে দুজনেই৷ বিকেলে সমুদ্র সৈকতে হাওয়া খেতে খেতে তৃষার কলকাতার গল্প, কলেজের গল্প সবই শুনল সাগর৷ সেও বলল তার জীবনের বিশেষ কিছু ঘটনা, অসমে একজন সীমান্তরক্ষীর জওয়ানের ডিউটির অনেক কাহিনী৷ বলতে বলতে মনের বেশ কাছাকাছি চলে এল দুজনে৷ তৃষার কথা বলতে পারবে না, কিন্তু সাগর তৃষার গভীর চাউনি, পুরু ঠোঁট, ফর্সা রঙের তন্বী নারী, ওই হলদে সালোয়ারে রঙটা যেন আরও ফুটে উঠেছে৷ মনে মনে ভাবল এক জওয়ানের পাশে তৃষাকে খুব মানাবে স্ত্রী হিসেবে৷ সমুদ্রের ধারে হাঁটতে হাঁটতে কত কী কল্পনা করে নিয়েছে সাগর৷ তৃষা এখনো বলেই চলেছে নিজের কথা৷ হঠাৎ কি মনে হল....
—"সাগর, কি ভাবছ ? "
—"নাঃ, কিছু না৷ আমি শুনছি তো৷"
—"না, শুনছিলেনা তুমি৷ বলো কি ভাবছিলে?"
—"তোমাকে বেশ সুন্দর লাগছে খোলা চুলে"
বেশ অকপটেই বলে ফেলল সাগর৷ শুনেই তৃষার সেই পাগল করা বাঁকা ঠোঁটের হাসি যেন রন্ধ্রেরন্ধ্রে বিদ্ধ করছে সাগরকে৷ আবার শুরু হল টিপটিপ বৃষ্টি এই সন্ধে বেলায়, অন্ধকার করে আসছে চারিদিক৷ দুজনে বেশ জোরেই পা চালাতে লাগল ঝুপড়ির দিকে৷ তৃষা জোরে হাঁটতে না পেরে সাগরের হাত ধরে হাটতে লাগল৷ দুজনের কারো পায়েই কিছু নেই৷ খালি পায়ে হাঁটার ওভ্যেস সাগরের থাকলেও তৃষার নেই৷ হঠাৎ পায়ে একটা ভাঙা শামুকের খোলাতে পা কেটে যায় তৃষার৷ বসে পড়ে সে৷ খুব বেশি লাগেনি যদিও, সাগর তৃষার পা থেকে ভাঙা খোলা বের করে দিল৷ হাঁটতে পারছে না তৃষা৷ অগত্যা সাগরকে কোলে উঠিয়ে চলতে হচ্ছে৷ নিজেকে এখন কোন হিন্দি সিনেমার হিরোর থেকে কম লাগছে না৷ তৃষার বুক ঠেকে আছে সাগরের বুকে, ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছেই৷ শেষে ঝুপড়ির কাছে পৌছাল৷ সন্ধে হয়ে গেছে, মেঘের ফাঁকে মাঝেমাঝে চাঁদের আলো দেখা যাচ্ছে৷ সাগরের বেশ রোমান্টিক লাগছে ব্যাপারটা৷
তৃষা ভয়ে আলাদা ঝুপড়িতে যায়নি, দুজনে এক জায়গায় বসে গল্প করছে৷ রাতের গল্পটা গাছের ফাঁক দিয়ে পড়া চাঁদের আলোতে বেশ জমে উঠেছে৷ হঠাৎ এক অচেনা শব্দে তৃষা ভয় পেয়ে জড়িয়ে ধরে সাগরকে৷ সাগরও সহসা ভেবে পায়না কিছু৷ তৃষা জড়িয়ে ধরেই বলে...
—"আমার অন্ধকারে খুব ভয় লাগে৷"
সাগরও জড়িয়েই ধরে থাকে৷ আবেগের কাছে হার মানে বিবেক, সাগরের ঠোট ছুঁয়ে যায় তৃষার গলা, পিঠের খোলা অংশ৷ বাধা দেয়না তৃষাও৷ ঠোঁট ছুয়ে যায় ঠোঁটে, সাগরের হাতের আদরে বশীভূত হয় তৃষার শরীর৷ গরম নিঃশ্বাসে গলে যায় দুটি মন৷ চাঁদের আলো, সমুদ্রের বাতাস, এই বট গাছ স্বাক্ষি থাকে দুজনার মিলনের৷ ক্লান্তির ক্লেশ ক্ষরিত হয়ে সুখশয্যায় শায়ীত হয় দুজনে৷ সকালে তৃষা আবিষ্কার করে নিজেকে সাগরের বুকে৷
আজ সকাল থেকে রোদ উঠেছে ভালই৷ সাগরকে খুজতে বেরিয়েছে বিকাশ এবং গাঁয়ের কিছু ছেলে মিলে৷ সকাল থেকে সাগর আর তৃষা সমুদ্রের ধারেই ঘুরছে, যদি কোন জেটি দেখতে পায়৷ একটা রাতেই দুজনের সম্পর্কটা বেশ বদলে গেল, অন্ততঃ সাগরের কাছে৷ সকাল থেকে তৃষার সাথে কথাগুলো যেন অনেক আপনজনের সাথে বলা কথার মতো লাগছে৷
প্রায় ঘন্টা চারেক প্রতিক্ষার পর দূরে এক জেটি দেখতে পেল তৃষা...
—"সাগর.. ওই দেখ একটা নৌকো, হেল্প, হেল্প...."
সাগর একটা ইউক্যালিপটাস গাছের ডাল ভেঙে নিজের মেরুন রঙের টি-শার্টটা বেঁধে ওপরে উঠিয়ে নাড়াতে লাগল৷ প্রায় মিনিট দশের মধ্যেই জেটিটি বেশ কাছাকাছি চলে এসেছে৷ তৃষা আর সাগর সমানে চিৎকার করছে৷ কিছুক্ষন পরেই একেবারে কাছে চলে এসেছে জেটি৷ সাগর দেখে বিকাশ ওপর থেকে হাত দেখিয়ে নিচে নেমে সাগরকে জড়িয়ে ধরে...
—"তুই কেমন আছিস, দুদিন এই ভয়ানক দ্বীপে কিভাবে ছিলি? জানিস এখানে সবাইকে আসতে নিষেধ করা হয়৷ জম্বুদ্বীপ নাম এটার৷ শোনা যায় বছর খানেক আগে এখানে দুজন নেমেছিল৷ তাদের বাঘে খেয়েছে৷ ভাগ্য ভাল তোদের কিছু হয়নি৷ চল এবার, বাড়িতে কাকি কেঁদে ভাসিয়ে দিচ্ছে৷ আমি সেদিন তোকে খুজলাম অনেক জানিস, কিন্তু কোথাও পেলাম না৷"
আবেগের অশ্রু গড়িয়ে আসে বিকাশ দার চোখে৷ সাগর বলে..
—"আমরা ঠিক আছি বিকাশ দা, চল এবার যাওয়া যাক৷ মা নিশ্চই খুব চিন্তা করছে৷"
তিনজনেই উঠে বসে জেটিতে৷ সবার সাথে তৃষার পরিচয় পর্বও শেষ৷ সাগরের হাবভাব দেখে তৃষার প্রতি তার দূর্বলতা টের পেয়েছে৷ বাড়িতে পৌছে দুজনকে দেখে সাগরের মায়ের আনন্দ আর ধরেনা৷ ভাল করে স্নান করে খাবার খাবার পর তৃষা একটা আলাদা ঘরে ঘুমোতে গেল আর সাগর তার মায়ের কাছেই শুয়ে পড়ল৷ ঘুমোবার আগে মায়ের কাছে তার তৃষার প্রতি দূর্বলতা আর পছন্দের কথা বলল সাগর৷ মায়েরও বেশ পছন্দ হয়েছে তৃষাকে৷
সন্ধে বেলা ঘুম থেকে উঠে তৃষা সাগরকে বলল..
—"আমার মোবাইল তো সমুদ্রেই পড়ে গেছে৷ বাড়িতে ফোন করে জানান হয়নি এখনো৷ একটা ফোন করার ব্যাবস্থা করে দাওনা.."
—"এই নাও, আমার ফোন থেকেই কল করে জানিয়ে দাও এখন৷ আমি একটু বাইরে থেকে আসছি৷"
মোবাইলটা তৃষাকে দিয়ে বেরিয়ে গেল সাগর৷ আধঘন্টা পর একটা মোবাইল আর জিও সিমকার্ড হাতে নিয়ে ঢুকল বাড়িতে৷
—"এই নাও তৃষা, এটা তোমার জন্য৷"
—"এ মা, তুমি মোবাইল কিনতে গেলে কেন? আমি বাড়িতে ফোন করে দিয়েছি৷"
—"এটা তোমার জন্য আমার গিফ্ট৷ What's app টা Install করে দিয়েছি৷ তোমার সাথে কথা তো বলতে পারব, যেখানেই থাকি৷"
কথাগুলো বেশ আবেগের সাথেই বলল সাগর৷ একলা ঘরে এক গভীর চুমু এঁকে দেয় তৃষা সাগরের ঠোঁটে৷
পরদিন সকালে তৃষার ফিরে যাবার কথা৷ একটুও ভাল লাগছেনা সাগরের, কদিন যদি থেকে যেত..... যাবার আগে কলকাতা গেলে দেখা করার প্রতিশ্রুতি, বাসে ওঠার আগে বারে বারে হাতে হাত ছুঁয়ে যাওয়া, দু চোখের চাউনিতে বিচ্ছেদের যন্ত্রনা সাগরের হৃদয়ে আলোড়ন তোলে৷
বাড়িতে পৌছে একবার ফোন করে জানায় যে পৌছে গেছে৷ এর পর আর কথা হয়নি এখনো৷ রাত্রে ফোন করে সাগর, ফোন বেজে চলে৷ Whats app এ ম্যাসেজ করে, নীল দাগ জানিয়ে দেয় তৃষা দেখেছে, কিন্তু কোন রিপ্লাই আসেনা৷ বেশ কিছুক্ষণ পর একটা ম্যাসেজ আসে..
"একটু ব্যাস্ত আছি, আজ সন্ধেবেলা কিছু বন্ধুদের সাথে বেরিয়েছি, পরে কথা বলছি৷"
সাগর রাত কাটায় সেই বিশেষ রাতের স্মৃতি রোমন্থন করে৷ রাত শেষ হয়ে সকাল হয়, প্রতিক্ষার সময় বেড়েই চলে৷ সকাল থেকে দুপুর গড়িয়ে সন্ধে নামে৷ সাগর ভাবে অনেকদিন পর তৃষা বাড়ি গেছে তাই সবার মাঝে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেনা৷ আবার ম্যাসেজ করে, নীল দাগ আসে, তবু রিপ্লাই নেই৷ এবার আবার ফোন করে সাগর... "আপনি যে নম্বরে ফোন করেছেন, সেটি ব্যাস্ত....." কল কেটে দেয় সাগর কিছুটা অভিমানের বশেই৷
দু দিন ভাল করে কথা হয়নি৷ মনে হাজার প্রশ্ন ভীড় করে আসে৷ কী মনে করে সাগর একবার ফেসবুকে তৃষার প্রোফাইল খোঁজার চেষ্টা করল৷ অনেক খুঁজে একটি প্রোফাইলে দেখে তৃষার ছবি, কিন্তু এ কোন তৃষা? হাতে হুক্কার পাইপ, সামনের টেবিলে নামান গ্লাসের তরলের রঙ দেখে মনে হচ্ছে ওয়াইন৷ পাশে একজন তৃষাকে একহাতে জড়িয়ে ধরে আছে৷ দেখে গতকাল তৃষার স্টেটাস আপডেট....
"After a Long time at favorite Hukka Bar with my Sweetheart..."
(অনেকদিন পর প্রিয় হুক্কাবারে আমার প্রেমিকের সাথে৷)
ঝড় উঠল সাগরের মনে, ঝড়ের দিনের ছবিগুলো বারবার রিপ্লে হতে লাগল মনে৷ সমুদ্রের ধারের সব কথা, সেই চোখের চাউনি, জনশূন্য দ্বীপে একসাথে কাটানো সেই রাত, তার উষ্ন আলিঙ্গন, তৃষার শরীরে তার ঠোঁটের অবাধ বিচরন, চাঁদের জোছনায় দুই শরীরের মিলন, সবই কি মিথ্যে ছিল? নাকি ছিল শুধু মুহুর্তের আবেগ? তৃষার মনে কি এতটুকু জায়গা পায়নি সাগর? তাহলে কেন সেদিন একলা বাড়িতে তৃষার ঠোঁট পুনরায় মিলেছিল সাগরের সাথে? ভাবতে ভাবতে দ্রুত বেরিয়ে যায় সাগরা সমুদ্রের পাড়ে৷ সমুদ্রে জোয়ারের শব্দ, সাগরের সমস্ত জিজ্ঞাসা, রাগ, ক্ষোভ সশব্দে ফেটে পড়ে, হৃদয়ের হাহাকার ছড়িয়ে পড়ে বাতাসে.......
✍ প্রভাত ঘোষ৷
-
সেদিন এক ফুরফুরে বাতাসের ছোঁয়ায় বড় পবিত্র ভেবেছিলাম নিজেকে৷ নতুন গাছে বসন্তের মুকুল৷ আনাড়ি পায়ে পায়ে নেচে উঠেছিল মন৷ বাগানে ফুল, আর ভ্রমর আস...
-
ভোরের বেলা হঠাৎ দরজায় কলিং বেলটা বেজে উঠল, কৃংকৃং ৷ নন্দিনী রাত্রেই শ্বসুরবাড়ি ছেড়ে চিরদিনের মত চলে এসেছে, আর ফিরবেনা কক্ষনো ওই মাতাল বরটার ...
-
॥#গুড_মর্নিং॥ (১) 💎💎💎💎💎💎 💜💛💚...